স্থানীয় নির্বাচনে এমপিও শিক্ষকদের প্রার্থী হতে ‘না’

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ৩১ বার
স্থানীয় নির্বাচনে এমপিও শিক্ষকদের প্রার্থী হতে ‘না’

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আইনসম্মত করতে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এসব প্রস্তাবের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। একই সঙ্গে ঋণখেলাপি, ঋণের জামিনদার এবং যাদের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি কিংবা অন্যান্য ইউটিলিটি বিল বকেয়া রয়েছে, তারাও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ হারাবেন।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের ১২তম কমিশন সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনসংক্রান্ত বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা করে কমিশন প্রয়োজনীয় সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। এসব সংশোধনী প্রস্তাব শিগগিরই আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নতুন বিধান কার্যকর হবে।

নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের আর্থিক দায়বদ্ধতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নৈতিক মানদণ্ড আরও শক্তিশালী করতেই নতুন যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইসি সচিব জানান, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদ—এই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আইন একযোগে পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিভিন্ন আইনে ছড়িয়ে থাকা অসামঞ্জস্য দূর করে একটি সমন্বিত ও আধুনিক নির্বাচন কাঠামো গড়ে তোলাই কমিশনের লক্ষ্য। সেই আলোকে সংশোধনের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিষয়ে কমিশনের অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক ছিল। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং দায়িত্ব পালনে প্রভাব পড়ার অভিযোগ উঠেছে। আবার সরকারি আর্থিক সুবিধাভোগী শিক্ষকদের রাজনৈতিক বা নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচন কমিশন তাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

নির্বাচন কমিশনের নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ঋণখেলাপির পাশাপাশি ঋণের জামিনদারদেরও প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। একইভাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোনসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি সেবার বিল বকেয়া থাকলেও প্রার্থী হওয়া যাবে না। কমিশনের মতে, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে হলে একজন প্রার্থীর আর্থিক দায়বদ্ধতা ও নাগরিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও বিবেচনায় থাকা প্রয়োজন।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বিধান কার্যকর হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের জবাবদিহিতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আর্থিক অনিয়ম বা দায়িত্বহীনতার অভিযোগ কমানোর ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ঋণের জামিনদারদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বাস্তবায়নের আগে আরও গভীর আইনগত বিশ্লেষণ প্রয়োজন হতে পারে।

কমিশন সভায় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তবে তারা ১৮ বছর পূর্ণ করার আগে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন না। ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়। এর আগে পর্যন্ত তাদের তথ্য নির্বাচন কমিশনের ডাটাবেজে ‘ডরম্যান্ট’ বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, তথ্য সংগ্রহের বর্তমান বয়সসীমা আরও কমানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে কমিশন কাজ করছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হবে। এসএসসি, অষ্টম শ্রেণি কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু করা যায় কি না, সেটিও পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, অল্প বয়স থেকেই নাগরিকদের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে ভোটার নিবন্ধন আরও সহজ, দ্রুত এবং নির্ভুল হবে। একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নাগরিক সেবা সম্প্রসারণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তথ্য সংগ্রহের বয়স কমানোর ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, তথ্য সংরক্ষণ এবং গোপনীয়তার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই এই নির্বাচনকে আরও গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক করতে আইন ও বিধিমালার সময়োপযোগী সংস্কার প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ উদ্যোগ সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে নতুন প্রস্তাবগুলো আইন হিসেবে কার্যকর হওয়ার আগে মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই, প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং পরবর্তী আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। ফলে বর্তমানে এগুলো কমিশনের সুপারিশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আইনগত অনুমোদনের পরই এসব বিধান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যকর হবে।

নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ রাজনৈতিক দল, নির্বাচন বিশ্লেষক, শিক্ষা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং নাগরিক সমাজের মধ্যেও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতবিনিময় শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন, এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং আধুনিক করতে নির্বাচন কমিশন যে সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে, তা ভবিষ্যতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এখন সংশোধনী প্রস্তাবগুলো আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শেষে কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহল, নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং সাধারণ মানুষের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত