কানের দুলের লোভে শিশুহত্যা, অভিযুক্তও নিহত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ১৪ বার
কানের দুলের লোভে শিশুহত্যা, অভিযুক্তও নিহত

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে আট বছরের এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণের পর শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনাকে ঘিরে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোক ও ক্ষোভের ছায়া। প্রাথমিকভাবে সোনার কানের দুলের লোভে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিখোঁজ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর শিশুটির হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করা হয় স্থানীয় এক ঝালমুড়ি বিক্রেতার বাড়ির আলমারির ড্রয়ার থেকে। পরে ঘটনাটি জানাজানি হলে উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে অভিযুক্ত নারীর মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে তাঁর বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। পুলিশ দুটি মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে।

নিহত শিশু ফারজানা খানম (৮) সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা গ্রামের বাসিন্দা এনামুল ইসলামের মেয়ে। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো সোমবার সকালে স্কুলের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয় ফারজানা। তবে স্কুলে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

শিশুটির সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয়দের সহায়তায় আশপাশের এলাকা এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ চালান। পরে এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে দেখা যায়, স্কুলের সামনে ঝালমুড়ি বিক্রেতা সুরাইয়া আক্তারের সঙ্গে ফারজানাকে যেতে দেখা গেছে। সেই সূত্র ধরে স্থানীয়রা ও পুলিশ সন্দেহভাজন ব্যক্তির বাড়িতে অনুসন্ধান চালায়।

রাতের দিকে অভিযুক্ত সুরাইয়া আক্তারের বাড়ির একটি আলমারির ড্রয়ার থেকে ফারজানার হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের প্রাথমিক আলামত দেখে পুলিশ ধারণা করছে, শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নিহত শিশুর খালা মরিয়ম বেগম অভিযোগ করেন, তাঁর ভাগ্নিকে সোনার কানের দুলের লোভে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ফারজানা প্রতিদিনের মতো সেদিনও সোনার কানের দুল পরে স্কুলে গিয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ, অভিযুক্ত সুরাইয়া আক্তার শিশুটিকে কৌশলে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। এরপর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মরদেহ আলমারির ভেতরে লুকিয়ে রাখেন। পরিবারের দাবি, একটি শিশুর সঙ্গে এমন নির্মম আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ঘটনার খবর দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত সুরাইয়া আক্তারকে গণপিটুনি দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে উত্তেজিত জনতা তাঁর বাড়িতে ভাঙচুর চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে এবং অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে নিহত শিশু ও অভিযুক্ত নারীর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় টহল জোরদার করেন এবং স্থানীয়দের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ও শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে।

সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম জানিয়েছেন, শিশু ফারজানা এবং অভিযুক্ত সুরাইয়া আক্তারের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় সব দিক গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে কানের দুলের লোভে হত্যার অভিযোগ উঠলেও এটিই একমাত্র কারণ কি না, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ সুপার আরও জানান, প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি। তবে তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই চলছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গণপিটুনির ঘটনাও আইনের দৃষ্টিতে একটি অপরাধ। কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলেও বিচার করার দায়িত্ব আদালতের। তাই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী কি না, তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। এ ঘটনায় গণপিটুনির বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। একই সঙ্গে অপরাধের ঘটনায় জনরোষ সৃষ্টি হলেও বিচারবহির্ভূত প্রতিক্রিয়া আইনের শাসনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ফারজানা ছিল প্রাণবন্ত ও মেধাবী একটি শিশু। প্রতিদিনের মতো স্কুলে গিয়েও আর জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে না পারায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

বর্তমানে কালীগঞ্জে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে দুই মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত