প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিও এবং তাঁর দ্বিতীয় বিয়ের দাবিকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ভাইরাল ভিডিও প্রকাশের পর যখন বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, তখন সামনে আসে একটি কাবিননামা। তবে সেই কাবিননামা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে নিবন্ধনকারী কাজীর বক্তব্যে। তিনি দাবি করেছেন, বিয়ে কোথায় এবং কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ ধারণা নেই। ঢাকা থেকে ফোনে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি কাবিননামা প্রস্তুত ও নিবন্ধন করেছেন।
ঘটনাটি সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। প্রথম দিকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোকে অনেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি বলে দাবি করলেও পরবর্তীতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই আলোচিত তরুণী মরিয়ম খাতুনকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী বলে উল্লেখ করেন। এরপর থেকেই বিয়ে, কাবিননামা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে আসতে থাকে।
কাবিননামা অনুযায়ী, বিয়েটি গত ১৭ জুন সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে কাবিননামা নিবন্ধনকারী সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের কাজী মাওলানা বি.এ.এম. বাকী বিল্লাহ জানিয়েছেন, তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না এবং বিয়ে কোথায় সম্পন্ন হয়েছে সেটিও জানেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার গভীর রাতে ঢাকা থেকে ফোনে যোগাযোগ করে তাঁকে জানানো হয় যে বিয়ে ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং নিবন্ধনের দায়িত্ব তাঁকে নিতে হবে।
কাজী বাকী বিল্লাহ বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি কাবিননামা প্রস্তুত করেন। তাঁর দাবি, কনের বাবা সরাসরি তাঁর সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় সম্মতি দেন এবং পরদিন সকালে কনে ও তাঁর অভিভাবক এসে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেন। তিনি আরও জানান, বিয়ের তারিখ ১৭ জুন উল্লেখ করার নির্দেশও তাঁকে ফোনের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর গ্রহণ করে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
কাবিননামায় কনের জন্মতারিখ ও বয়স নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কাবিননামায় কনের জন্মতারিখ ২২ মে ২০০৮ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কাজী দাবি করেছেন, তাঁকে যে তথ্য দেওয়া হয়েছিল, সেই তথ্য অনুযায়ী তিনি জন্মতারিখ লিখেছেন এবং তাঁর হিসাবে কনের বয়স ছিল ১৮ বছর ৩ মাস। বয়স ও জন্মতারিখের এই তথ্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে একটি বায়োডাটার তথ্য। ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা মরিয়ম খাতুনের একটি বায়োডাটা সংগ্রহ করেছে, যেখানে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ২২ জুনের স্বাক্ষর রয়েছে। ওই বায়োডাটায় সবুজ কালিতে হাতে লেখা রয়েছে, ‘জোর সুপারিশ করছি।’ কিন্তু একই বায়োডাটায় মরিয়মের বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তথ্য সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, যদি ১৭ জুন বিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে মাত্র কয়েক দিন পর ২২ জুন স্বাক্ষর করা বায়োডাটায় কেন তাঁকে ‘অবিবাহিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বলে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ভাইরাল ভিডিও প্রকাশের পর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া মরিয়ম খাতুন এবং মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ পৃথক ভিডিও বার্তায় একই ধরনের বক্তব্য দেন। সেখানে দাবি করা হয়, পারিবারিক সম্মতির ভিত্তিতে তিন লাখ টাকা দেনমোহরে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ওই ভিডিওতে একটি কক্ষে গাজী নজরুল ইসলামকে কয়েকজন ব্যক্তি ঘিরে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে দেখা যায়। ভিডিওতে উপস্থিত কয়েকজন তাঁকে উদ্দেশ করে জানতে চান, তিনি কেন এমন কাজ করেছেন এবং ঘটনাটি কতদিনের। ভিডিওতে সংসদ সদস্যকে মাথা নেড়ে নিজের ভুল স্বীকার করতে এবং ‘বিশ্বাস করেন, আজই প্রথম’ বলতে শোনা যায়। একই ভিডিওতে তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদের ভিডিওটি মুছে দেওয়ার অনুরোধও করেন। যদিও ভিডিওটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং ধারণের সময়-স্থান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে এবং সাংগঠনিকভাবে পর্যালোচনা শেষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো কাবিননামা বা ব্যক্তিগত নথি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং প্রশাসনিক রেকর্ড পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বা নথিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং আনুষ্ঠানিক তথ্যের অপেক্ষা করা উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় যখন জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে, তখন স্বচ্ছতা ও তথ্যের যথার্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের ঘটনায় গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং অসমর্থিত দাবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেই বিষয়টির মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় বিয়ে, কাবিননামা, জন্মতারিখের তথ্য এবং বিয়ের নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে এলেও এসব বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট তথ্য ও নথিপত্র যাচাইয়ের দিকেই নজর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।