পটিয়ায় বন্যার ক্ষত: বিধ্বস্ত ৬২ সড়ক, ক্ষতি ২৮ কোটি টাকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ বার
পটিয়ায় বন্যার ক্ষত: বিধ্বস্ত ৬২ সড়ক, ক্ষতি ২৮ কোটি টাকা

প্রকাশ:  ২৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা পটিয়া। কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই জনপদ সাম্প্রতিক বন্যার ধাক্কায় ভয়াবহ অবকাঠামোগত সংকটের মুখে পড়েছে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি এখন নেমে গেলেও রেখে গেছে ধ্বংসস্তূপ, দুর্ভোগ আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছাপ। বিশেষ করে উপজেলার গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও রাস্তার অর্ধেক অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, কোথাও ধসে পড়েছে কালভার্ট, আবার কোথাও পিচ উঠে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। এতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পটিয়া উপজেলা কার্যালয়ের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় উপজেলার ৬২টি গ্রামীণ সড়ক এবং ৮টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১ কিলোমিটার। অবকাঠামোগত এই ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য প্রায় ২৮ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতুর তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং বরাদ্দ পাওয়ার পর স্থায়ী সংস্কারকাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে এলজিইডি।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, একসময় যেসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতেন, সেগুলোর অনেকগুলো এখন দুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ পথে পরিণত হয়েছে। কোথাও স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে ইট ফেলে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন, কোথাও বাঁশের সাঁকো তৈরি করে কোনো রকমে যোগাযোগ চালু রাখা হয়েছে। বর্ষার কাদায় পিচ্ছিল হয়ে থাকা এসব পথ দিয়ে প্রতিদিন মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছে।

কুসুমপুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আবদুল করিম বলেন, বন্যার সময় সড়ক ভেঙে যাওয়ার পর এখনো কোনো স্থায়ী সংস্কার হয়নি। অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, ছোট যানবাহনও প্রবেশ করতে পারছে না। অসুস্থ ব্যক্তিদের কাঁধে করে মূল সড়ক পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁর মতে, দ্রুত সংস্কার না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

আশিয়া ইউনিয়নের গৃহবধূ রাশেদা বেগম বলেন, তাঁর সন্তান প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যায়। কিন্তু রাস্তার মাঝখানে বড় বড় গর্ত থাকায় প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে হয়। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

কচুয়াই ইউনিয়নের কৃষক আবদুল হামিদ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে কৃষিপণ্য বাজারে নিতে চরম সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত খরচ যোগ হয়েছে। ফলে বাজারে পণ্য বিক্রি করেও আগের মতো লাভ হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম। তিনি বলেন, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে পণ্য পরিবহনে সময় দ্বিগুণ লাগছে। অনেক পরিবহন দুর্গম রাস্তায় যেতে চায় না। এতে ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতির মুখে পড়ছেন, তেমনি সাধারণ ভোক্তারাও প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহে সমস্যায় পড়ছেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য, দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু না হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং স্থানীয় বাজার ব্যবস্থার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। তাঁরা জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে স্থায়ী ও টেকসই সংস্কারকাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন।

এলজিইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত যেসব এলাকায় যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা মনে করছেন, শুধু পুরোনো পদ্ধতিতে রাস্তা সংস্কার করলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার ঘটনা আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু দেশের অনেক গ্রামীণ সড়ক এখনো পুরোনো নকশায় নির্মিত হওয়ায় সেগুলো এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম নয়। তাই ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় রেখে জলবায়ু-সহনশীল নকশা, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, উঁচু বাঁধ এবং টেকসই নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে গ্রামীণ সড়ক নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে তারা মত দিয়েছেন।

পটিয়া উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) তন্ময় নাথ জানিয়েছেন, বন্যায় উপজেলার ৬২টি সড়ক এবং ৮টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। যেসব স্থানে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে সব ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর স্থায়ী সংস্কারকাজ শুরু হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু জরুরি মেরামত নয়, ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম এমন টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেবে। কারণ গ্রামীণ সড়ক শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি। দ্রুত ও স্থায়ী সংস্কার ছাড়া পটিয়ার হাজারো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত