প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রংপুরের তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনেশ্বরী নদীর পানি হঠাৎ করেই বিপৎসীমা অতিক্রম করায় দুই তীরের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাতের পর বুধবার সকালে নদীর পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করলে ভাঙনের আশঙ্কায় নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, অতীতে যমুনেশ্বরী নদীর পানি এভাবে বিপৎসীমা অতিক্রম করার ঘটনা তারা খুব কমই দেখেছেন। ফলে নদীর আকস্মিক পানি বৃদ্ধি তাদের মধ্যে নতুন করে দুশ্চিন্তার জন্ম দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টায় তারাগঞ্জ উপজেলার বারাতি পয়েন্টে যমুনেশ্বরী নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ৩৪ দশমিক ৬৮ মিটার। অথচ ওই স্থানে বিপৎসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ দশমিক ৫৩ মিটার। অর্থাৎ নদীর পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নদীর দুই পাড়ে বসবাসকারী মানুষ সম্ভাব্য ভাঙন ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষাকালে যমুনেশ্বরী নদীতে পানি বৃদ্ধি স্বাভাবিক হলেও এবার পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। নদীর কিছু অংশে তীব্র স্রোতের কারণে তীরের মাটি ধসে পড়তে শুরু করেছে। অনেক পরিবার বাড়িঘর ও ফসলি জমি নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে। বিশেষ করে যেসব বাড়ি নদীর খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে, সেসব পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।
প্রবীণ বাসিন্দা মোজাফফর হোসেন বলেন, জীবনের দীর্ঘ সময়ে বহু বর্ষা দেখেছেন, কিন্তু যমুনেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার ঘটনা আগে কখনো দেখেননি। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন সমাজ উন্নয়নকর্মী হরলাল রায়। তাঁর মতে, নদীর এমন আচরণ স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা এবং এতে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে ভাঙনের ভয় তৈরি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যমুনেশ্বরী একটি দেশীয় নদী। এর উৎপত্তি নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলায়। এরপর নদীটি জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, রংপুরের তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ অতিক্রম করে পীরগঞ্জে করতোয়া নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। যেহেতু নদীটি আন্তর্জাতিক বা সীমান্তবর্তী নদী নয়, তাই সাধারণত উজানের ঢলের প্রভাব পড়ে না এবং বিপৎসীমা অতিক্রমের ঘটনাও বিরল।
কর্মকর্তাদের মতে, ডোমার, ডিমলা এবং আশপাশের উজান এলাকায় কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে এসে যমুনেশ্বরী নদীর পানির স্তর বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে পানির উচ্চতা বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায়।
রংপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ডালিয়ায় ২২ মিলিমিটার, কাউনিয়ায় ১৮ মিলিমিটার এবং রংপুরে ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, টানা বৃষ্টির প্রভাবেই নদীটির পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, টানা বৃষ্টির কারণেই যমুনেশ্বরী নদীর পানির স্তর বেড়েছে। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বৃষ্টিপাত কমে গেলে দ্রুতই পানির স্তর স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও জানান, নদীতীরবর্তী এলাকার পরিস্থিতির ওপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন। কোথাও ভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে অনেক ছোট ও দেশীয় নদীতেও হঠাৎ পানি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে বন্যা বা নদীভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাই নদী ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পানি পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
স্থানীয় কৃষকরাও নদীর পানি বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে নদীর তীরবর্তী ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও প্রয়োজন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও নদীর পাড়ে অপ্রয়োজনে অবস্থান না করার এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যমুনেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রমের এ ঘটনা স্থানীয়দের জন্য অস্বাভাবিক হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, বৃষ্টিপাত কমে এলে পানির স্তর দ্রুত হ্রাস পাবে। তবু পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য যেকোনো ঝুঁকি দ্রুত মোকাবিলা করা যায়।