প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় একটি সরকারি বিদ্যালয়ের জমি দখলের চেষ্টা, মাটি কাটা এবং বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর নুরুজ্জামান কাফির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় কাফির পাশাপাশি তাঁর বাবা এবিএম হাবিবুর রহমান এবং বড় ভাই মামুনকে আসামি করা হয়েছে। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন। তবে কাফি তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুলাই পটুয়াখালীর কলাপাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে খেপুপাড়া সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুর রহিম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. ফেরদৌস মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অভিযোগটি প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করে আদালত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম নির্ধারণ করা হবে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১১ জুলাই সকাল প্রায় সোয়া ১০টার দিকে অভিযুক্তরা একটি ভেকু মেশিন, ট্রলি, কোদাল, খোন্তাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে খেপুপাড়া সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন রজপাড়া মৌজার বিএস ১২ নম্বর খতিয়ানের ৫৯ নম্বর দাগভুক্ত জমিতে প্রবেশ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে তারা বিদ্যালয়ের জমি থেকে মাটি কেটে জমির আকৃতি পরিবর্তন করেন এবং বেআইনিভাবে একটি চলাচলের রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, বিষয়টি জানতে পেরে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুর রহিম পাঁচজন সহকারী শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান এবং নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। বাদীর অভিযোগ, এ সময় নুরুজ্জামান কাফি ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। শিক্ষকরা ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে অভিযুক্তরা তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, ধাক্কাধাক্কি করেন এবং বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্তরা বিদ্যালয়ের জমির প্রায় ১১০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৩০ ফুট প্রস্থজুড়ে, অর্থাৎ প্রায় ছয় শতাংশ জমি থেকে মাটি কেটে ট্রলির মাধ্যমে অন্যত্র সরিয়ে নেন। এরপর সেখানে কংকর ফেলে স্থায়ীভাবে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা করা হয়। বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই কর্মকাণ্ডে বিদ্যালয়ের প্রায় পাঁচ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দেয়। বিদ্যালয়ের জমির মালিকানা, জমি ব্যবহারের অধিকার এবং অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, বিদ্যালয়ের জমি রক্ষা করা প্রয়োজন, অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের কথাও উল্লেখ করছেন। তবে এসব দাবির বিষয়ে এখনো প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন নুরুজ্জামান কাফি। গণমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, পুরো ঘটনাটি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে সাজানো হয়েছে। তাঁর দাবি, যে জমিকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, সেটির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন আদালতে মামলা চলেছে এবং সর্বোচ্চ আদালত প্রকৃত ওয়ারিশদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি সেই ওয়ারিশদের কাছ থেকেই বায়না সূত্রে জমিটি ক্রয় করেছেন।
কাফির ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কোনো ধরনের জমি দখল, চাঁদাবাজি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের সঙ্গে জড়িত নন। বরং আইনগতভাবে বৈধ প্রক্রিয়ায় জমি ক্রয়ের পর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, প্রশাসন যদি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে, তাহলে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি পাওয়া যাবে না।
এ ঘটনায় মামলায় কাফির বাবা এবিএম হাবিবুর রহমান ও বড় ভাই মামুনকেও আসামি করা হয়েছে। তবে তাঁদের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি। মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালত কোনো অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিলে সেটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়। তদন্তের মাধ্যমে সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়, আর অভিযোগের ভিত্তি না মিললে আইন অনুযায়ী ভিন্ন সিদ্ধান্তও আসতে পারে।
জমি-সংক্রান্ত বিরোধ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এসব ঘটনায় প্রশাসনিক তদন্ত, ভূমি রেকর্ড, আদালতের রায় এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালত ও তদন্তকারী সংস্থার প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করে।
বর্তমান ঘটনাটিও এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। একদিকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্ত নুরুজ্জামান কাফির সরাসরি অস্বীকার—দুই পক্ষের বিপরীত অবস্থানের কারণে তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর বাস্তবতা। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী কলাপাড়া থানা তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দিলে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন দাবি সামনে আসায় যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য কিংবা সম্পূর্ণ মিথ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও আইনজ্ঞরা মনে করছেন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত