প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রায় ৬ বছর বয়সী শিশুদের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে এবং তাদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ইস্যু করা হবে। পরবর্তীতে তারা ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করলেই আলাদা আবেদন ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নাগরিক পরিচয় ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, নির্ভুল ও দীর্ঘমেয়াদি করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের খুব অল্প বয়স থেকেই একটি স্থায়ী জাতীয় পরিচয় নম্বরের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বয়স গোপন করে ভোটার হওয়ার প্রবণতা কমবে, এনআইডিতে ভুল তথ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং ভবিষ্যতে পরিচয়পত্র সংশোধনের প্রয়োজনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ১৬ বছর বয়স পূর্ণ হলে একজন বাংলাদেশি নাগরিক জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য নিবন্ধন করতে পারেন। তবে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হয় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হবে। অর্থাৎ, নাগরিক জীবনের শুরু থেকেই একজন ব্যক্তি একই পরিচয় নম্বর ব্যবহার করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের নাগরিক তথ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্য, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য নথিতে তথ্যের অসামঞ্জস্য দেখা যায়। ছোটবেলা থেকেই একটি একক পরিচয় নম্বর ব্যবহৃত হলে এসব সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
তবে বিষয়টি এখনো নীতিগত আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, সারাদেশের প্রতিটি নাগরিককে একটি একক পরিচয় ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য থেকেই বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা ও পর্যালোচনা প্রয়োজন।
শিশুদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করলে তাদের শারীরিক পরিবর্তনের বিষয়টি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যমান আইনে প্রতি ১৫ বছর পরপর এনআইডির ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য হালনাগাদের বিধান রয়েছে। নতুন পরিকল্পনাতেও একই ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ শিশু অবস্থায় নিবন্ধনের পর নির্ধারিত সময় অন্তর ছবি, আঙুলের ছাপ এবং অন্যান্য বায়োমেট্রিক তথ্য হালনাগাদ করা হবে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য এবং নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর মতে, জন্মের পর থেকেই একজন নাগরিকের জন্য একটি স্থায়ী পরিচয় নিশ্চিত করার ধারণা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ছোটবেলা থেকেই একটি নির্দিষ্ট পরিচয় নম্বর থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সরকারি সেবা গ্রহণ অনেক সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের এনআইডি ব্যবস্থার মূল দর্শনই ছিল জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন নাগরিকের জন্য একটি অভিন্ন পরিচয় বহাল রাখা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে এই পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এটি বাস্তবায়নের আগে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
জেসমিন টুলীর মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ভিত্তিক নিবন্ধন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করাও খুব কঠিন হবে না। কারণ দেশে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে শিক্ষার্থীদের একটি বিস্তৃত তথ্যভান্ডার ইতোমধ্যে রয়েছে। সেই তথ্যের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডারের সমন্বয় করা গেলে শিশুদের নিবন্ধন কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, খুব অল্প বয়সী শিশুদের পূর্ণাঙ্গ বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ বাস্তবসম্মত নয়। একজন মানুষের আঙুলের ছাপ ও অন্যান্য বায়োমেট্রিক বৈশিষ্ট্য সাধারণত ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সের দিকে পরিপূর্ণতা লাভ করে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে মৌলিক পরিচয় তথ্য সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করাই যৌক্তিক হবে।
তিনি আরও বলেন, এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত গবেষণা, পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাড়াহুড়ো করে কার্যক্রম শুরু করলে তা প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে। বরং পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিকল্পিতভাবে এগোলে এটি দেশের নাগরিক পরিচয় ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
উল্লেখ্য, এর আগে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী নাগরিকদের নিবন্ধনের জন্য একটি পরিপত্র জারি করে। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০১০ (২০১৩ সালে সংশোধিত)-এর ধারা ৫ অনুযায়ী ১৬ বছর পূর্ণ হলেই নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে ভোটাধিকার কার্যকর হয় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর।
সেই সময় নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেছিলেন, ১৬ বছর বয়স থেকেই নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করা হলে প্রয়োজনীয় পরিচয় তথ্য আগেই সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা, ব্যাংক হিসাব খোলা, পাসপোর্ট, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৮৩ লাখ ২৩ হাজার ২৪০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৫২ লাখ ১২ হাজার ৭৩১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার ২৬৬ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৪৩ জন। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত এবং নির্ভুল হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় পরিচয়পত্র শুধু ভোটাধিকার নয়, বরং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল পরিচয়। তাই শৈশব থেকেই নাগরিকদের একটি একক পরিচয় ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারি সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে তথ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আইনি কাঠামো এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ওপর।