সরকারি গুদামে রেকর্ড খাদ্য মজুদ, নিরাপত্তায় বাড়ল স্বস্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১৭ বার
সরকারি গুদামে রেকর্ড খাদ্য মজুদ, নিরাপত্তায় বাড়ল স্বস্তি

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে বর্তমানে চাল, গম ও ধান মিলিয়ে ফ্লোটিং মজুদসহ মোট ২৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৬৩ টন খাদ্যশস্য সংরক্ষিত রয়েছে, যা দেশের নিরাপদ খাদ্য মজুদের নির্ধারিত সীমার তুলনায় প্রায় ১০ লাখ ২৪ হাজার টন বেশি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই উচ্চমাত্রার মজুদ শুধু সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেনি, বরং প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারে অস্থিরতা কিংবা জরুরি মানবিক পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ জুলাই পর্যন্ত সরকারি গুদামগুলোতে ১৯ লাখ ৬০ হাজার ৭৪৬ টন চাল, ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬৮৯ টন গম এবং ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬০৫ টন ধান মজুদ রয়েছে। ধান থেকে চালে রূপান্তরের হিসাব এবং ৮ হাজার ৭৩৫ টন ফ্লোটিং চাল যুক্ত করে মোট খাদ্যশস্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৬৩ টনে। এই পরিমাণ মজুদ দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু উৎপাদন বাড়ানোই নয়, পর্যাপ্ত সরকারি মজুদ বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় খাদ্য বিতরণ এবং দুর্যোগকালীন জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারি মজুদই সবচেয়ে বড় ভরসা। বর্তমানে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য সংরক্ষিত রয়েছে, তা সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করেছে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ খাদ্য মজুদের সর্বনিম্ন সীমা ধরা হতো ১৩ লাখ ৫০ হাজার টন। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় সরকার এই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ১৬ লাখ টনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান মজুদ সেই নতুন লক্ষ্যমাত্রারও অনেক বেশি হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত সরকারি খাদ্য মজুদ কেবল সংকট মোকাবিলার জন্য নয়, বাজার ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন বাজারে চাল বা গমের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয় কিংবা মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন সরকার মজুদ থেকে খাদ্যশস্য সরবরাহের মাধ্যমে বাজারে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে। এতে সাধারণ ভোক্তা যেমন উপকৃত হন, তেমনি বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।

খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সরকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি গুদামগুলোর মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ইতোমধ্যে ২৪ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ২৭ লাখ টনে উন্নীত করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করে ৩৪ লাখ টনে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। নতুন আধুনিক সাইলো, উন্নত গুদাম এবং প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্যশস্যের অপচয় কমানো এবং দীর্ঘ সময় গুণগতমান অক্ষুণ্ন রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ অভিযানও ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৩১ টন ধান ও চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৪৯৮ টন ধান, ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৪২০ টন সেদ্ধ চাল এবং ৭৬ হাজার ৮১৪ টন আতপ চাল। একই সময়ে ৫২৩ টন গমও সংগ্রহ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে ধান সংগ্রহ এবং মিলারদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহের কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকারি সংগ্রহ অভিযানের সফলতায় কৃষকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্ধারিত মূল্যে সরাসরি ধান বিক্রির সুযোগ পাওয়ায় অনেক কৃষক ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে চালকল মালিকদের সহযোগিতায় সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগিয়ে গেছে। এতে একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদিত ফসলের বাজার নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে সরকারি খাদ্য মজুদও শক্তিশালী হয়েছে।

খাদ্য আমদানির ক্ষেত্রেও সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট ৩ লাখ ২০ হাজার ৮০০ টন খাদ্যশস্য দেশে এসেছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই চাল ও গম আমদানি অব্যাহত রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ সময় সরকারি ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল ও গম আমদানির কার্যক্রম চলমান ছিল এবং বেসরকারি খাতও আমদানির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সময়ে খাদ্য সহায়তা হিসেবে বিদেশি অনুদানের প্রয়োজন হয়নি, যা দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংগ্রহ অধিশাখার যুগ্মসচিব মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ অভিযান অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। কৃষক, চালকল মালিক এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত চাল ও গমের মজুদ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) গবেষণা পরিচালক ফিরোজ আল মাহমুদ বলেন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক খাদ্যবাজারের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চাহিদা মাথায় রেখে খাদ্যশস্যের মজুদ ও সংরক্ষণ অবকাঠামো আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন বলেন, সরকারি গুদামগুলোতে শুধু খাদ্যশস্যের পরিমাণ বাড়ানোই নয়, সেগুলোর গুণগতমান ও নিরাপদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে খাদ্যশস্যের অপচয় কমিয়ে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি কৃষকদের কাছ থেকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ধান ও চাল সংগ্রহ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম সচল রাখতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ওঠানামা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার সময়ে শক্তিশালী সরকারি খাদ্য মজুদ একটি দেশের জন্য কৌশলগত সম্পদ হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য সরকারি গুদামে রয়েছে, তা শুধু স্বল্পমেয়াদি চাহিদা পূরণেই নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলাতেও সরকারের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে তারা একই সঙ্গে উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং খাদ্যশস্যের অপচয় কমানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। কৃষি উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, আমদানি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় বজায় রেখে সরকার যে উচ্চমাত্রার খাদ্য মজুদ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, পরিকল্পিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতেও বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত