বায়ুদূষণে শীর্ষে কায়রো, দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা অষ্টম

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
বায়ুদূষণে শীর্ষে কায়রো, দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা অষ্টম

প্রকাশ: ৩০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে বিশ্বজুড়ে বড় শহরগুলোর বায়ুদূষণের মাত্রা দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে বিষাক্ত গ্যাস ও ধূলিকণার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি এখন চরম রূপ ধারণ করেছে। এমন এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (আইকিউএয়ার) প্রকাশিত সর্বশেষ বায়ুদূষণের সূচকে বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি ঢাকার অবস্থান রয়েছে তালিকার অষ্টম স্থানে। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী ঢাকার বাতাস দূষণের তীব্র শিকারে পরিণত হয়েছে, যা নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে প্রতিনিয়ত মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক স্বনামধন্য বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্বের বিভিন্ন দূষিত শহরের এই তুলনামূলক তালিকা প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত ওই সূচকে দেখা গেছে যে, বায়ুদূষণের দিক থেকে বর্তমান বিশ্বের সমস্ত শহরকে পেছনে ফেলে তালিকার একেবারে শীর্ষে অবস্থান করছে মিশরের ঐতিহাসিক রাজধানী কায়রো। মিসরের এই প্রাচীন ও ব্যস্ত নগরীর বর্তমান বায়ুমান স্কোর রেকর্ড করা হয়েছে ১৭২। বিশেষজ্ঞদের মানদণ্ড অনুযায়ী, এই মাত্রার বায়ুর মানকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা সেখানকার সাধারণ পথচারী ও নগরবাসীর শ্বাসতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কায়রোর এই ভয়াবহ বায়ুদূষণ পরিস্থিতি পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকান অঞ্চলের পরিবেশগত অবনতির চিত্রকেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

আইকিউএয়ারের বায়ুদূষণের দৈনিক এই বিশ্বতালিকায় কায়রো ছাড়াও বিশ্বের আরও কয়েকটি মেগাসিটি অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসা, যার বায়ুদূষণের স্কোর ১৭০। এর পরেই তালিকার তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা, যেখানে বায়ুর মান স্কোর রেকর্ড করা হয়েছে ১৬০। অন্যদিকে, আমাদের দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ও বৃহত্তম শহর লাহোর রয়েছে তালিকার চতুর্থ অবস্থানে, যার বর্তমান বায়ুমান স্কোর দাঁড়িয়েছে ১৪০। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত উন্নত এবং আধুনিক শহর হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহর রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে, যার বায়ুমান স্কোর হলো ১৩১। এই বৈশ্বিক পরিসংখ্যান থেকে এটি স্পষ্ট যে, কেবল অনুন্নত দেশগুলোই নয়, বরং উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধারার মেগাসিটিগুলোই আজ বায়ুদূষণের চরম থাবায় জর্জরিত।

আইকিউএয়ারের নির্ধারিত বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বায়ুর মানের স্কোর শূন্য থেকে পঞ্চাশ পর্যন্ত ভালো হিসেবে বিবেচিত হয়। স্কোর একান্ন থেকে একশ পর্যন্ত মাঝারি বা সন্তোষজনক হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে স্কোর যখন একর এক থেকে একশ পঞ্চাশের ঘরে পৌঁছায়, তখন তাকে সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর বলে বিবেচনা করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে প্রকাশিত সূচকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বায়ুমান স্কোর রেকর্ড করা হয়েছে ১২৩, যা স্পষ্টতই সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর ক্যাটাগরিতে পড়ে। এই অবস্থায় শিশু, প্রবীণ নাগরিক এবং আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট বা হৃদরোগে আক্রান্ত অসুস্থ রোগীদের বাড়ির ভেতরে নিরাপদে থাকার এবং অন্যদেরও ঘরের বাইরের অপ্রয়োজনীয় কার্যক্রম ও ঘোরাফেরা সীমিত করার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। স্কোর একান্ন থেকে দুইশ পর্যন্ত পৌঁছালে তাকে সাধারণভাবে অস্বাস্থ্যকর বায়ু বলে মনে করা হয়।

এ ছাড়া বায়ুদূষণের মাত্রা আরও মারাত্মক রূপ নিলে অর্থাৎ স্কোর যখন দুই থেকে তিনশ বা তারও ওপরে চলে যায়, তখন তাকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ কিংবা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ধরনের চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে শহরের সাধারণ বাসিন্দাদের গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয় এবং চোখ জ্বালাপোড়া করা থেকে শুরু করে ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বায়ুদূষণের মাত্রা মূলত পাঁচটি প্রধান ও বিপজ্জনক উপাদানের ওপর ভিত্তি করে পরিমাপ করা হয়। এগুলো হলো পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম টেন এবং পিএম টু পয়েন্ট ফাইভ, নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড এবং ওজোন গ্যাস। এর মধ্যে অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা বা পিএম টু পয়েন্ট ফাইভ মানবদেহের ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে রক্তে মিশে যেতে পারে, যা স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বেশি ঘাতক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

সাধারণত বর্ষাকালে আকাশ থেকে মুষলধারে বৃষ্টিপাতের কারণে ঢাকার বাতাসের মানে কিছুটা স্বস্তি ও উন্নতি লক্ষ্য করা যায়, কারণ বৃষ্টির পানি বায়ুমণ্ডলের ধূলিকণা ও বিষাক্ত কণাগুলোকে মাটিতে নামিয়ে আনে। কিন্তু বর্ষা মৌসুম পার হয়ে শুষ্ক ও শীতকাল শুরু হলেই ঢাকার বায়ুদূষণ তার আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে অত্যন্ত মারাত্মক ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনির্দিষ্ট হিসাব ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ এই বায়ুদূষণের বিষাক্ত প্রভাবে প্রতি বছর স্ট্রোক, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যানসার এবং বিভিন্ন মারাত্মক শ্বাসতন্ত্রের জটিলতায় ভুগে আনুমানিক প্রায় সত্তর লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে থাকে। পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিক সমাজের জোর দাবি, ঢাকার এই ভয়াবহ বায়ুদূষণ রোধ করতে হলে কেবল মৌসুমি পদক্ষেপ নিলে চলবে না, বরং ইটভাটার কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসবিহীন পুরোনো যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ির সময় পর্যাপ্ত পানি ছিটানো এবং সর্বোপরি সুপরিকল্পিত সবুজায়নের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় মেগাসিটি ঢাকার বায়ুমান আরও বেশি অবনতির দিকে যাবে এবং নগরবাসীর জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত