গ্যাস সংকটে বন্ধ হাজারো কারখানা, কমছে রপ্তানি আদেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৫ বার
গ্যাস সংকটে বন্ধ হাজারো কারখানা, কমছে রপ্তানি আদেশ
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক শিল্পখাত বর্তমানে এক গভীর ও নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি বা গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সাভার, আশুলিয়া এবং গাজীপুর এলাকার অন্তত এক হাজার পোশাক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সময়মতো পণ্য তৈরি করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠাতে না পারায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা হারাচ্ছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের এই খাতের ওপর, এবং ইতোমধ্যে গত এক মাসের ব্যবধানে সামগ্রিক রপ্তানি আদেশ তিন শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
গাজীপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ইন্টারলুক বিডি কারখানার মতো দেশের অগণিত কারখানা বর্তমানে মারাত্মক দুর্দিনে দিন কাটাচ্ছে। ইউরোপের খ্যাতনামা কয়েকটি ব্র্যান্ডের পোশাক প্রস্তুতকারক এই কারখানাটিতে গ্যাস সংকটের কারণে গত দুই সপ্তাহের মধ্যে অন্তত পাঁচ দিন সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। যেসব দিন কারখানা আংশিক চালু ছিল, সেগুলোতেও কোনোভাবেই পূর্ণ কর্মঘণ্টা কাজ চালানো সম্ভব হয়নি। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের অভাবে কারখানাটির স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কারখানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিকল্প উপায়ে সিএনজি স্টেশন থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস সংগ্রহ করে কোনো রকমে সক্ষমতার সামান্য অংশ সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের সুরাহা মেলেনি।
পোশাক উৎপাদনের পুরো কাঠামোটি একটি সুনির্দিষ্ট চেইন বা শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদনের কোনো একটি নির্দিষ্ট ধাপে কাজ বন্ধ হয়ে গেলে পরবর্তী প্রক্রিয়াগুলোর সঙ্গে যুক্ত সম্পূর্ণ কাজই থমকে যায়। গ্যাসের অভাবে ডাইং, ফিনিশিং এবং কাঁচামাল সরবরাহের মূল চেইন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো শিপমেন্ট করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের হাতে পণ্য বুঝিয়ে দিতে না পেরে অনেক উদ্যোক্তা আকাশপথে অতিরিক্ত ব্যয় করে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে একদিকে যেমন তৈরি হচ্ছে বিশাল অঙ্কের আর্থিক লোকসান, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের দীর্ঘদিনের আস্থার জায়গাটি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ফলস্বরূপ, আগামী দিনগুলোতে দেশের পোশাক খাতের রপ্তানি আদেশ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটেগরির পাশাপাশি ওভেন খাতের অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। নিট কারখানার প্রায় শতভাগ ফেব্রিক্স বা প্রয়োজনীয় কাপড় স্থানীয় বস্ত্রকলগুলো থেকে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে গত দুই সপ্তাহ ধরে বস্ত্রকলগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও অর্জন করতে পারছে না। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এই পরিস্থিতিকে একটি ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিগত সময়ে ভুল নীতি এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে দেশ আজ ধীরে ধীরে একটি আমদাননির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। গ্যাসের অভাবে স্থানীয়ভাবে সুতা ও কাপড় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অতীতেও বিপুল পরিমাণ সুতা বিদেশ থেকে আমদানি করতে বাধ্য হয়েছে দেশ। বিগত দুই বছরে দেড় শতাধিক বস্ত্রকল চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে এবং চালু থাকা বাকি মিলগুলোর উৎপাদন ক্ষমতাও বর্তমানে ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
পরিস্থিতির গভীরতা অনুধাবন করে দেশের বিভিন্ন কারখানায় কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে চার থেকে পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষণা করা হচ্ছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক কারখানা দিনে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা উৎপাদন সচল রাখতে পারছে, অথচ শ্রমিকদের পুরো দিনের নিয়মিত মজুরি ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ ও উৎপাদন শূন্যতার কারণে অনেক মালিকপক্ষ সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে সাময়িক ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে যেসব কারখানার ওপর জরুরি শিপমেন্টের প্রচণ্ড চাপ রয়েছে, তারা উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে চরম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, অর্থবছরের প্রথম মাসে রপ্তানি আয়ের অঙ্ক কিছুটা সন্তোষজনক দেখালেও ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন বা ইউডি সনদ গ্রহণের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে রপ্তানিতে বড় ধরনের স্থবিরতা নেমে আসার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির ওপর অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তাদের পূর্বনির্ধারিত রপ্তানি আদেশ কমিয়ে দিয়েছে কিংবা সরবরাহের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা বাড়িয়ে দিয়েছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে ক্রেতারা চুক্তি বাতিল করতে পারে অথবা পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অবিক্রীত পণ্য অত্যন্ত কম মূল্যে স্থানীয় বাজারে স্টকলাট হিসেবে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন উদ্যোক্তারা, যা পুরো খাতকে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করা, টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারের পক্ষ থেকে সময়োপযোগী ও কার্যকর নীতি-সহায়তা প্রদান করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি। অন্যথায় দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এই তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘমেয়াদে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত