ঝুঁকিপূর্ণ দেওয়ানহাট সেতু: অভিভাবকহীন ওভারপাসে বাড়ছে আতঙ্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৫ বার
ঝুঁকিপূর্ণ দেওয়ানহাট সেতু: অভিভাবকহীন ওভারপাসে বাড়ছে আতঙ্ক
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক দেওয়ানহাট ওভারপাসটি আজ এক চরম অস্তিত্বসংকট ও তীব্র অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। নগরীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে সংযুক্তকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটি দীর্ঘকাল ধরে কোনো ধরনের কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ও অভিভাবকত্ব ছাড়াই টিকে রয়েছে। অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় আগে নির্মিত এই সেতুটির মালিকানা বা দায়িত্ব নিতে চার দেশের বা চারটি প্রধান সরকারি সংস্থা একে অপরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে সুনির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ সেতুটির দেখভাল না করায় এর অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে এটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় প্রতিদিন এর ওপর দিয়ে চলাচলকারী হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও পরিবহন চালকেরা এক গভীর ও অন্তহীন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
১৯৭৪ থেকে ১৯৭৫ সালের দিকে নির্মিত এই ওভারপাসটি বন্দরনগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। সে সময় রেললাইনের ওপর দিয়ে নির্বিঘ্নে যানবাহন চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও আর্থিক সহায়তায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ চট্টগ্রামের প্রথম এই ওভারব্রিজটি নির্মাণ করেছিল। প্রায় ১ হাজার ২২০ ফুট দীর্ঘ এবং ৫৬ ফুট প্রস্থের এই শক্তিশালী সেতুটি দিয়ে বিগত বহু বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ভারী এবং হালকা উভয় ধরনের যানবাহন চলাচল করে আসছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেতুটির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির প্রশ্নটি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকে গেছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে—এই চার সংস্থার কেউই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সেতুটির পূর্ণাঙ্গ অভিভাবকত্ব বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কাঁধে নিতে রাজি হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের কোনো সংস্কার বা মেরামতের কাজ না হওয়ায় জরাজীর্ণ এই ওভারপাসটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে উঠেছে। সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সেতুটির বিভিন্ন পিলার বা খুঁটি থেকে সিমেন্ট ও বালুর আস্তর খসে পড়ে ভেতরের রডগুলো সম্পূর্ণ জং ধরা অবস্থায় বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সেতুর বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ার পাশাপাশি জন্ম নিয়েছে ছোটবড় আগাছা, যা এর ভঙ্গুর দশাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। অথচ এই ঝুঁকিপূর্ণ ও নড়বড়ে অবকাঠামোর ওপর দিয়েই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ভারী কাভার্ডভ্যান, লরি, ট্রাক, বাস এবং ব্যক্তিগত কারসহ হাজার হাজার বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। সেতুটির কোনো একটি অংশ হঠাৎ ধেসে পড়লে বা ভেঙে পড়লে তা পুরো বন্দরনগরীর মূল ট্রাফিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এক নিমিষে অচল করে দিতে পারে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে বিগত সময়গুলোতে মাঝেমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতার কারণে তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে সেতুটি নতুন করে পুনর্নির্মাণের একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে সেতুর দুই পাশে নির্দিষ্ট উচ্চতায় উচ্চতা প্রতিবন্ধক বা হাইট ব্যারিয়ার বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরবর্তীতে সেই উদ্যোগের বাস্তবায়ন আর সম্পন্ন হয়নি। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মতে, সাধারণত তারা কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করে তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নিকট হস্তান্তর করে থাকেন। ফলে সেতুটির দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের দায়িত্ব নিতে তারা শেষ পর্যন্ত অনীহা প্রকাশ করেন, যা দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি করে।
সেতুটির চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা এবং সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর তাগিদে অবশেষে টনক নড়েছে নগর কর্তৃপক্ষের। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি মেয়রের উপস্থিতিতে এক বিশেষ সভায় এই ওভারপাসের বিপজ্জনক বাস্তব চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়। বর্তমান কাঠামোর কংক্রিটের ক্ষয়, রডের মারাত্মক মরিচা এবং উপরিভাগের ফাটল দূর করতে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দলের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে না ফেলে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘রেট্রোফিটিং’ এবং ‘স্ট্রেংদেনিং’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেতুটিকে পুনরায় মজবুত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই আধুনিক প্রকৌশল কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে সেতুর পিলারের ভার বহন বা লোড ক্ষমতা শতকরা পঁয়তাল্লিশ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে এবং এর সামগ্রিক স্থায়িত্ব আরও ত্রিশ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র গণমাধ্যমে নিজের মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে জানান যে, দেওয়ানহাট ওভারপাসটি বর্তমানে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি অবস্থায় উপনীত হয়েছে এবং এর সংস্কার কাজ আরও অনেক আগেই সম্পন্ন করা উচিত ছিল। বর্তমান বাস্তবতায় সেতুটির কাঠামোকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শক্তপুক্ত ও নিরাপদ করে তোলার কাজটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে কেবল সাময়িক সংস্কারই যথেষ্ট নয়, বরং এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামোগুলোর স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একটি সংস্থাকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব অর্পণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় সামান্য অবহেলার কারণে যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। নগরবাসীর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে এবং বন্দরনগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত ও দ্রুত পদক্ষেপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত