প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম অংশ হিসেবে পরিচিত সিলেট-জকিগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের চারখাই-গোলাপগঞ্জ অংশ বর্তমানে এক ভয়াবহ ও করুণ দশায় উপনীত হয়েছে। এই দীর্ঘ আঞ্চলিক মহাসড়কটির চারখাই থেকে গোলাপগঞ্জ হয়ে সিলেটমুখী অংশ এবং এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী ঢাকাদক্ষিণ, শিকপুর ও ভাদেশ্বর সংযোগ সড়কগুলোর প্রতিটি পদে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত, ফাটল ও খানাখন্দ। সড়কের দীর্ঘ ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কার্পেটিং সম্পূর্ণ উঠে গিয়ে পিচঢালাইয়ের চিহ্নমাত্র আর অবশিষ্ট নেই। সামান্য বৃষ্টিতেই এই গর্তগুলোতে পানি জমে একাকার হয়ে যায়, যার ফলে পুরো সড়কটি চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পূর্ব সিলেটের কয়েক লাখ সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াত এখন চরম দুর্ভোগ, উৎকণ্ঠা এবং এক অবর্ণনীয় আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিগত ২০২২ সালের ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী বন্যার পর এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে কোনো ধরনের বড় ও টেকসই সংস্কার কাজের ছোঁয়া লাগেনি। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিদের চরম উদাসীনতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত পড়ে রয়েছে এই জনপথ। মাঝে মাঝে নামমাত্র কিছু মেরামত কাজ চালানো হলেও, যেমন সড়কের বড় বড় গর্তে কাদামাটি চাপা দেওয়া কিংবা দায়সারাভাবে ইট-সোলিংয়ের সাময়িক প্রলেপ লাগানোর ব্যবস্থা করা হলেও তা স্থায়ী হয়নি। সামান্য বৃষ্টিপাত শুরু হলেই সেই কাঁচা মাটি বা ইটের প্রলেপ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যায় এবং সড়কটি পুনরায় আগের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক ও বেহাল অবস্থায় ফিরে আসে। বর্ষার মৌসুমে সড়কে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে লুকিয়ে থাকা গর্তে চাকা পড়ে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে, আর শুষ্ক মৌসুমে যানবাহনের চাকার ঘর্ষণে ও বাতাসে উড়ন্ত ধুলাবালুতে চারপাশের পরিবেশ হয়ে উঠছে সম্পূর্ণ বিষাক্ত ও অস্বাস্থ্যকর।

প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক দিয়ে হাজার হাজার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকুরিজীবী, বিভিন্ন অফিসগামী যাত্রী এবং জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা জরুরি রোগীদের জীবনের তীব্র ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। সড়কের বেহাল দশার কারণে যাত্রীবাহী বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর নিয়মিত চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। স্থানীয় এক অটোরিকশা চালক জিলু মিয়া অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে জানান যে, সড়কের গভীর গর্তে হুট করে চাকা আটকে গিয়ে কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি উল্টে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা সবসময়ই মাথায় নিয়ে তাদের চলতে হয়। রাস্তার এই দুরবস্থার কারণে অনেক সময় দীর্ঘ যানজটের কবলে পড়ে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় হয়। এ কারণে বহু চালক এখন আর এই ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে যাত্রী নিয়ে সিলেট শহরে যাতায়াত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, যা সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিকে আরও বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঢাকাদক্ষিণ এলাকার স্থানীয় সচেতন নাগরিক সাকিব আল মামুন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কোনো মুমূর্ষু বা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে যদি সময়মতো উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা শহরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া না যায়, তবে রাস্তায় ঘটে যাওয়া দীর্ঘ যানজট ও বিলম্বের কারণে রোগীর বড় ধরনের ক্ষতি হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার কে নেবে? সাধারণ মানুষের নিয়মিত পরিশোধিত ট্যাক্সের অর্থে দেশের অর্থনীতি সচল থাকলেও এত গুরুত্বপূর্ণ একটি যাতায়াত পথ বছরের পর বছর ধরে সংস্কারের বাইরে পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য। পূর্ব সিলেট অঞ্চলের জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট এবং পার্শ্ববর্তী মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার লাখ লাখ মানুষের জেলা সদর ও রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ও সংক্ষিপ্ত পথ এটি। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক অগ্রগতির পূর্বশর্তই হলো একটি নিরাপদ ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা আজ এই অঞ্চলের মানুষের জন্য সোনার পাথরবাটিতে পরিণত হয়েছে।

সড়কটির এমন করুণ পরিণতির কারণে এই জনপদের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান দিন দিন ব্যাহত হচ্ছে। অথচ জনগুরুত্বপূর্ণ এই সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রতিদিনের এই যন্ত্রণাদায়ক যাতায়াত থেকে মুক্তি পেতে এবং বড় ধরনের কোনো মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটার আগেই চারখাই-গোলাপগঞ্জ সড়কটির দ্রুততম সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই সংস্কার নিশ্চিত করার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ। অন্যথায় দীর্ঘদিনের এই ক্ষোভ যেকোনো সময় বড় ধরনের জনরোষে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা। জনগণের দীর্ঘদিনের এই অবর্ণনীয় দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সড়ক ও জনপথ বিভাগ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এমনটাই এখন এই জনপদের প্রতিটি মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা।