১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা সংসদে আনবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৮ বার

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট, ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আগামী এক দশকের জন্য দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবে সরকার বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হবে দেশের প্রতিটি ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, শিল্পায়নের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।

রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের সমুদ্রসৈকতে আয়োজিত এক জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে স্থানীয় উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃষি, বিনিয়োগ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনাহীনভাবে পরিচালনা করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অতীতে এ খাতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সীমিত কয়েকজনের স্বার্থকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছিল, যার ফলে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে।

তিনি জানান, আগামী ১০ বছরের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। সংসদে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর ধাপে ধাপে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন শুরু হবে। এর মাধ্যমে দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা এবং আবাসিক এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবহন খাতের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের বিষয়েও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে।

তারেক রহমান বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস ছাড়া শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ কিংবা কর্মসংস্থান কোনো ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ কারণেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের রূপরেখা প্রস্তুত করছে।

বিগত কয়েক দিনে জ্বালানি খাত নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতভিন্নতা থাকতে পারে, তবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভিত্তিহীন প্রচারণা জনগণের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সরকার সংসদে পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে এবং যার বিকল্প প্রস্তাব থাকবে, তিনি সেটিও জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেন। তবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে দেশের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করা গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বিদেশি বিনিয়োগের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এমন একটি পরিবেশ প্রত্যাশা করেন যেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত থাকে। শিল্পকারখানার উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বন্দরে পৌঁছানো এবং কাঁচামাল সহজে কারখানায় আনার সুযোগ থাকলে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও শক্তিশালী হয়। সেই লক্ষ্যেই সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা বিনিয়োগের বিষয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আনোয়ারা এলাকায় চীনের জন্য একটি বড় শিল্পাঞ্চল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি চীন সফরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে কয়েকশ শিল্পকারখানা গড়ে তোলার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু হলে চট্টগ্রামসহ আশপাশের এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে তাঁর আশা।

তিনি বলেন, নতুন শিল্পায়নের মাধ্যমে শুধু কর্মসংস্থানই বাড়বে না, বরং রপ্তানি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং শিল্পখাতের সম্প্রসারণ জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে নতুন গতি দেবে।

সমাবেশে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। শুধু ধান, পাট কিংবা অন্যান্য ফসল উৎপাদনকারী কৃষক নন, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণচাষিদেরও এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।

বাঁশখালীর লবণচাষিদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় অনেক লবণচাষি আর্থিক সংকটে রয়েছেন। সরকার এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং এমন একটি মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে উৎপাদকরা লাভজনক দামে লবণ বিক্রি করতে পারেন। শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

তারেক রহমান বলেন, কৃষককে শক্তিশালী না করলে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে না। কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে সরকার কৃষকদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি, প্রণোদনা এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা আরও সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

স্থানীয় উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বাঁশখালী উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে সরকার দেশের বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বাঁশখালীও সেই কর্মসূচির আওতায় আসবে, যাতে স্থানীয় মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা নিজ এলাকাতেই পেতে পারেন।

তিনি আরও জানান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় চলতি মাসের মধ্যেই বাঁশখালী উপজেলার ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো বিভিন্ন সরকারি সহায়তা কর্মসূচির সুবিধা সহজে গ্রহণ করতে পারবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের ঘোষণা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ হতে পারে। তবে পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য এবং কার্যকর তদারকির ওপর। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপচয় কমানোর বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন সময়োপযোগী উদ্যোগ হলেও সেটি বাস্তবসম্মত তথ্য, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। সংসদে পরিকল্পনাটি উপস্থাপনের পর এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য এবং বাস্তবায়ন কাঠামো সামনে এলে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত