প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আনন্দঘন মুহূর্তকে কেন্দ্র করে মিষ্টির বাজারে উপচেপড়া ভিড় ও অতিরিক্ত চাহিদাকে পুঁজি করে কোনো অসাধু চক্র যাতে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। পরীক্ষার ফল প্রকাশের ঠিক আগের দিন গতকাল রবিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের বিভিন্ন নামকরা মিষ্টির দোকান ও উৎপাদন কারখানায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মিষ্টি তৈরি, ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি এবং চরম অসচেতনতার দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে মোট এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় প্রশাসনের এমন সময়োপযোগী ও কঠোর পদক্ষেপকে সচেতন নাগরিক সমাজ অত্যন্ত সাধুবাদ জানিয়েছে।
জানা গেছে, সোমবার সকাল ১০টায় চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। যেকোনো পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর পরই শিক্ষার্থী ও তাদের আনন্দিত স্বজনদের মিষ্টি মুখ করানোর মাধ্যমে সাফল্য উদ্যাপনের এক চিরন্তন সামাজিক প্রথা আমাদের দেশে প্রচলিত রয়েছে। এই বিশেষ দিনটিতে বাজারে মিষ্টির চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই সুযোগে কিছু অসাধু ও মুনাফালোভী মিষ্টি ব্যবসায়ী সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে অস্বাস্থ্যকর ও বাসি মিষ্টি বাজারে ছাড়তে পারে—এমন আশঙ্কার কথা মাথায় রেখেই জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আগেভাগে এই বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল।

রবিবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী ও প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান এবং কারখানায় হঠাৎ করেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এন এম কায়সার এবং উপস্থিত ছিলেন জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. আসিফুর রহমানসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। সরেজমিন পরিদর্শনের সময় মিষ্টি তৈরির কারখানাসমূহে চরম অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ দেখে কর্মকর্তারা হতবাক হয়ে যান। ময়লা-আবর্জনাকীর্ণ মেঝে, খোলা আকাশের নিচে মিষ্টির পাত্র ফেলে রাখা, মিষ্টির ওপর মাছি ও ক্ষতিকর পোকামাকড়ের অবাধ বিচরণ এবং কোনো ঢাকনা ছাড়াই খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ করার মতো মারাত্মক সব স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ অনিয়ম সেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও ভেজাল পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের এমন নগ্ন চিত্র দেখে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
নিরাপদ খাদ্য অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিধিভঙ্গের অপরাধে শহরের চিহ্নিত চারটি মিষ্টির দোকান ও কারখানাকে মোট ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী আদর্শ মাতৃ ভান্ডার, মেসার্স মধুরাজ মিষ্টান্ন ভান্ডার, সুপরিচিত ভোলাগিরি মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং মহাদেব মিষ্টান্ন ভান্ডার কারখানা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন যে, শিশু ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো ধরনের ছিনিমিনি খেলা সহ্য করা হবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ পুনরাবৃত্তি হলে আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করা হবে বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়।
অভিযান শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. আসিফুর রহমান বলেন, যখনই দেশে কোনো বড় পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ পায়, তখনই মিষ্টির বাজারে ক্রেতাদের প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ্য করা যায়। সোমবার এসএসসির ফল প্রকাশিত হবে বিধায় বাজারে মিষ্টির ব্যাপক চাহিদা তৈরি হবে এবং সেই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল বা অস্বাস্থ্যকর মিষ্টি বিক্রি করতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই আমরা পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছি। জনগণের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই শহরজুড়ে ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দারুণ স্বস্তি ও সচেতনতা ফিরে এসেছে। অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সন্তানদের সোনালী সাফল্যের আনন্দকে বিষিয়ে তুলতে পারে এমন ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর মিষ্টির কবল থেকে কোমলমতি শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে রক্ষা করতে প্রশাসনের এই ধরনের অভিযান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। শুধু পরীক্ষার ফলাফলের দিনেই নয়, বরং সারা বছরই জুড়েই সব ধরনের খাবার হোটেলের রান্নাঘর এবং মিষ্টির কারখানায় এ ধরনের কঠোর মনিটরিং ও নজরদারি বজায় রাখা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে না পড়ে।