দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও নজিরবিহীন লোডশেডিং

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ বার
দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও নজিরবিহীন লোডশেডিং
প্রকাশ: ১১ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রধান জ্বালানি গ্যাস ও কয়লার তীব্র ঘাটতির কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাতে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও শিল্পাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলগুলোতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। জ্বালানি সংকট এবং বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশের মোট একচল্লিশটি বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর বাইরে যেসব কেন্দ্র চালু রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই তাদের পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। গত কয়েকদিন ধরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান এতটাই বেড়ে গেছে যে সাধারণ মানুষের জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তীব্র গরমে ফ্যান, এসি কিংবা পানির পাম্পের মতো অতিপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সচল রাখতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিসহ সর্বস্তরের মানুষ।
বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা পূর্বের সমস্ত রেকর্ডকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি লোডশেডিং হচ্ছে। মাত্র দশ ঘণ্টার ব্যবধানে পূর্বের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। গত রোববার বিকেল তিনটায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছিল তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। এরপর গভীর রাতে অর্থাৎ রাত একটায় সেই ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পেয়ে তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে গিয়ে ঠেকেছে। এর আগে গত ৩ আগস্ট রাত একটায় সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। এমনকি বর্তমান সরকারের বিগত সময়ের তুলনায়ও এই লোডশেডিংয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৭ জুন সর্বোচ্চ লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছিল তিন হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট। চলমান এই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের মূল কারণ হিসেবে গ্যাস ও কয়লার চরম সংকটকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশের একটি বিরাট অংশ এখনো প্রধানত গ্যাসনির্ভর। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে সামান্য ঘাটতি দেখা দিলেই তার সরাসরি ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদার পরিমাণ প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে লোডশেডিং কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত একশ থেকে একশো দশ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র সত্তর কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশের থেকেও কম গ্যাস পাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। একসময় কেবল গ্যাসভিত্তিক খাত থেকেই প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো, যা এখন কমে নেমে এসেছে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াটে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও অবকাঠামো বাস্তবে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কেবল জ্বালানির অভাবে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাস সংকটের এই মারাত্মক ধাক্কাটি মূলত শুরু হয়েছিল গত একুশ জুলাই থেকে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে গ্যাস সরবরাহে এক বিশাল ধস নামে। ওই টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে দৈনিক প্রায় ষাট কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ করেই কমে যায় এবং দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে মাত্র ২১৪ কোটি ঘনফুটে। ঘটনার প্রায় পনেরো দিন পর আংশিক মেরামতের মাধ্যমে বর্তমানে পঁচিশ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কিছুটা সচল করা সম্ভব হয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি এখনও তার পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেনি। পেট্রোবাংলার অপারেশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টার্মিনালটির পূর্ণাঙ্গ মেরামত কাজ শেষ হতে আরও দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করা সম্ভব হলে আরও ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করা যাবে, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, কারণ দেশের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন দিন দিন কমে আসছে এবং আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গ্যাস সংকটের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহের জটিলতা বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে আরও বহুগুণে তীব্র করে তুলেছে। দেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক হাজার দুশো মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়ার কারণে কুতুবদিয়ায় বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা খালাসের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে কয়লা যথাসময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময়ের অপচয় ঘটছে। অন্যদিকে ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। কেন্দ্রটি সাধারণত বাংলাদেশেকে প্রায় এক হাজার চারশো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও গত কয়েকদিন ধরে তা কমে আটশো থেকে এক হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। ঝাড়খণ্ডে চলমান অতিরিক্ত বন্যার কারণে কয়লা ভিজে যাওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তবে আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে কয়লার সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক হলে তারা আবার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরে যেতে পারবেন। বর্তমানে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় সাত হাজার নয়শো পঁয়তাল্লিশ মেগাওয়াট হলেও এর বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের মতো। রামপাল ও বড়পুকুরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন হ্রাসের ফলে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই ব্যাপক ঘাটতির সরাসরি এবং নির্মম খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ গ্রাহক ও জনসাধারণকে। দেশের অনেক অঞ্চলে বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে দিন ও রাতের মিলিয়ে প্রায় দশ থেকে বারো ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। তীব্র গরমের এই মৌসুমে একটানা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান কিংবা এসি চালানো তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানির পাম্প বা মোটরগুলোও চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে ছোট-বড় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা এবং বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক কাজকর্মে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ মানুষেরা এই তীব্র গরমে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অমানবিক দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। গত সোমবার সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও একই রকম করুণ চিত্র দেখা যাচ্ছে, যেখানে সন্ধ্যার পর লোডশেডিংয়ের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে।
শিল্পাঞ্চলগুলোতেও বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সংকটের কারণে এক দ্বিমুখী চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। উদ্যোক্তারা অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে আকস্মিক বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে কারখানার উৎপাদন লাইন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় এবং বিদ্যুৎ ফিরে আসার পরও মেশিনপত্রগুলো স্বাভাবিক গতিতে চালু করতে প্রচুর সময়ের অপচয় হয়। বাধ্য হয়ে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত খরচে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে, যার ফলে ব্যবসায়িক উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের পেছনের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন হ্রাস, আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অতিরিক্ত একপাক্ষিক নির্ভরতা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তাকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, কেবল সাময়িকভাবে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাড়তি গ্যাস সরবরাহ করে লোডশেডিং কিছুটা কমানো সম্ভব হলেও তা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য অযৌক্তিক ব্যয় সংকোচন, সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে জোরদার উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত