কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১৩২ জনের প্রাণহানি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৩ বার
কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১৩২ জনের প্রাণহানি
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ আমেরিকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ কলম্বিয়ায় আঘাত হানা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভয়াবহ ভূমিকম্পে পুরো দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দেশটির চোকো প্রদেশে সংঘটিত এই আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে একশ বত্রিশ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এই মর্মান্তিক ঘটনায় চারশোরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন বলে সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। শক্তিশালী এই ভূকম্পনের ফলে মুহূর্তের মধ্যে বহু বহুতল ভবন, আবাসিক বাড়িঘর এবং জনবহুল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ধসে পড়া এসব বিশাল কংক্রিটের স্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ কিংবা আটকা পড়ে আছেন বলে তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম চালিয়ে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছেন বিধায় আশঙ্কা করা হচ্ছে যে ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজ সম্পূর্ণ হলে হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা আরও অনেক বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, স্থানীয় সময় গত সোমবার সকাল সাতটা চৌত্রিশ মিনিটে দক্ষিণ আমেরিকার এই রাষ্ট্রে আকস্মিক ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূকম্পনটির উৎপত্তিস্থল ছিল সান হোসে দেল পালমার এলাকার প্রায় ১০৭ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত। কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটা থেকে প্রায় চারশো কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই অঞ্চলে কম্পনের তীব্রতা এতটাই প্রকট ছিল যে পুরো দেশ কেঁপে ওঠে। এমনকি এর শক্তিশালী প্রভাব প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা এবং ইকুয়েডরের সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও স্পষ্টভাবে টের পাওয়া গেছে। তবে সৌভাগ্যবশত এই ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরপরই সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলো থেকে কোনো ধরনের সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি, যা উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজনকে বড় ধরনের আরেকটি দুর্যোগ থেকে রক্ষা করেছে।
ভূমিকম্পের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে দেশটির ঐতিহ্যবাহী কফি উৎপাদনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত রিসারালদা প্রদেশে। বিশেষ করে প্রদেশটির প্রাণকেন্দ্র পেরেইরা শহর এবং তার আশপাশের জনপদগুলোতে ধ্বংসলীলার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধু পেরেইরার মহানগর অঞ্চলেই অন্তত চল্লিশ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রায় পঁয়ষট্টিটি বড় বড় ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। এসব ধসে পড়া ভবনের মধ্যে অন্তত পনেরোটির মূল ধ্বংসস্তূপের নিচে সাধারণ মানুষ এখনও আটকে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিসিসির পক্ষ থেকে যাচাই করা এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও চিত্রে পেরেইরার ঐতিহাসিক ও প্রধান চত্বর প্লাজা বলিভারে একটি সুউচ্চ ভবন চোখের পলকে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার অত্যন্ত মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। ভবনটি ধসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক পুরু ধুলোবালি ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে যায় এবং গোটা এলাকায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই চরম সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এবং লুটপাট কিংবা বিশৃঙ্খলা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন পেরেইরার কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় মঙ্গলবার ভোর পাঁচটা পর্যন্ত কঠোর কারফিউ জারি করতে বাধ্য হয়েছিল।
অন্যদিকে, ভূমিকম্পের মূল উৎপত্তিস্থলের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত সান হোসে দেল পালমারে বড় ধরনের কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। স্থানীয় মেয়র লিওন ফাবিও মারিন মোনকাদা গণমাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন যে ওই এলাকার কিছু প্রধান সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও অলৌকিকভাবে সেখানে কোনো প্রাণহানি বা গুরুতর আহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের সরাসরি প্রভাবে দেশটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিমানবন্দর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দরগুলোর তালিকায় রয়েছে পেরেইরা, ম্যানিজালেস, কিবদো, আরমেনিয়া, কার্তাগো এবং বুয়েনভেনতুরা। রাজধানী বোগোটাতেও এই শক্তিশালী কম্পন অত্যন্ত জোরালোভাবে অনুভূত হয়েছে। আকস্মিক ভূকম্পনের সময় বোগোটার রাজপথের প্রকাণ্ড গাছপালা এবং ট্রাফিক সিগন্যালগুলো প্রচণ্ড বেগে দুলতে থাকে। রাজধানীর কয়েকটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেওয়ার খবর পাওয়া গেলেও সৌভাগ্যবশত সেখানে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের অবকাঠামোগত ধস বা প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেশজুড়ে এই অপ্রত্যাশিত ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা। তিনি পুরো দেশজুড়ে জাতীয় দুর্যোগ পরিস্থিতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন। সরকারের এই বিশেষ ঘোষণার ফলে দেশের জরুরি বিভাগগুলো অতি দ্রুততার সঙ্গে যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বিশেষ নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে এবং প্রয়োজনে জাতীয় বাজেটের বিভিন্ন খাতের বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করে উদ্ধারকাজে অর্থায়ন করতে পারবে। প্রেসিডেন্টের দেওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি আবাসিক বাড়িঘর সম্পূর্ণরূপে কিংবা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ ৭ মাত্রার কাছাকাছি এই শক্তিশালী কম্পন তীব্রভাবে অনুভব করেছেন। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ভূমিকম্পের গভীরতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় তা ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি সংঘটিত অন্যান্য ভূমিকম্পের মতো তাৎক্ষণিক ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ না চালালেও এর গভীর প্রভাবের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবকাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। বর্তমানে সমগ্র কলম্বিয়ায় শোকের আবহ বিরাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার সহযোগিতায় উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত