প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার লক্ষে সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে দুই দেশের সপ্তম পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের পরামর্শ সভা। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কূটনৈতিক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা খতিয়ানের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ও অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি ছিল জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানানো। দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে এই আমন্ত্রণকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা, যা আগামী দিনগুলোতে ঢাকা ও টোকিওর মধ্যকার সহযোগিতামূলক ক্ষেত্রগুলোকে আরও বেশি প্রশস্ত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজধানীর একটি মিলনায়তনে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রসচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম এবং জাপানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির জ্যেষ্ঠ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিরোয়ুকি নামাজু। আলোচনা চলাকালীন জাপানি জ্যেষ্ঠ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির এই বিশেষ আমন্ত্রণপত্র ও বার্তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পৌঁছে দেন। একই সঙ্গে তিনি ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকেও জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানান। এর জবাবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে একটি সরকারি সফরে ঢাকা আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা দুই দেশের কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে গভীর বন্ধুত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।

বৈঠকে দুই দেশের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। বিশেষ করে জাপানের ‘অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স’ বা ওএসএ কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত আরও শক্তিশালী করার প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে স্থান পায়। বাংলাদেশ তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কৌশলগতপ্রয়োজন অনুযায়ী এই কাঠামোর মাধ্যমে জাপানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। ইতিপূর্বে এই কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পাঁচটি আধুনিক টহল নৌকা উপহার বা সরবরাহ করেছে জাপান, যার জন্য টোকিওকে ধন্যবাদ জানায় ঢাকা। বাংলাদেশের এই যৌক্তিক ও প্রতিরক্ষামূলক অনুরোধের বিপরীতে জাপানি প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব ও সায় দেওয়া হয়েছে, যা উভয় দেশের নিরাপত্তাগত অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে।
এছাড়া বাংলাদেশের মেগাপ্রজেক্ট ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে জাপানের দীর্ঘমেয়াদী অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হয় বৈঠকে। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প, দেশের সর্বাধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম ঢাকা মেট্রো রেল এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে জাপানের ‘বিগ-বি’ উদ্যোগের ধারাবাহিক সহায়তার প্রশংসা করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব। সবুজ জ্বালানি বা রিনিউয়েবল এনার্জি খাত এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাপানি আধুনিক প্রযুক্তি ও বড় ধরনের আর্থিক বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ। তবে জাপানি ঋণের উচ্চ সুদের হার নিয়ে বাংলাদেশ কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করলে, জাপানি প্রতিনিধিদল খোলামেলাভাবে স্বীকার করে যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঋণের সুদের হার কিছুটা বেশি হলেও এটি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং অন্যান্য দেশের বেলাতেও সাধারণভাবে প্রযোজ্য একটি নিয়ম।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু স্থান পায়। মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি বা ইপিএ দ্রুত চূড়ান্ত করা, বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে তা রপ্তানি করা এবং শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক পারস্পরিক বিনিময় বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের স্থায়ী উপায় খুঁজে বের করতে এবং বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীকে নিজ দেশে সসম্মানে ফিরিয়ে নিতে জাপানের অব্যাহত রাজনৈতিক ও মানবিক সহযোগিতা কামনা করে ঢাকা। সবমিলিয়ে, এই সফল পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ সভা বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার বিদ্যমান কূটনৈতিক সুসম্পর্ককে এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহল।