জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জামায়াতের ৪ দফা প্রস্তাব

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৮ বার
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জামায়াতের ৪ দফা প্রস্তাব

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ‘চ্যালেঞ্জ’ গ্রহণ করে চার দফা প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকারের অগ্রগতি ৯০ দিনের মধ্যে জনগণের সামনে প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে দলটি। রোববার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় চলমান জ্বালানি সংকট ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে সংকট মোকাবিলাকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতে বিরোধীদের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জামায়াতের এই নেতা দাবি করেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তিন মাস আগেই সরকারকে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল বিরোধী দল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই প্রস্তাব সরকারের কাছে থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং সংকটের দায় বিরোধীদের ওপর চাপিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করা হচ্ছে, যা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধী দল সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চায় না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে দেশের স্বার্থে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে কার্যকর প্রতিযোগিতা থাকা উচিত। তিনি সংকট নিরসনে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি বিকল্প প্রস্তাবগুলোও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রথমে অংশীজনদের নিয়ে একটি ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি এনার্জি সেল’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। দলটির মতে, জ্বালানি সংকটের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, বিশেষজ্ঞ, জ্বালানি খাতের পেশাজীবী এবং অন্যান্য অংশীজনকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। একটি সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা গেলে সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছে দলটি।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার মধ্যে জরুরি ওয়ার্কওভার ও সংস্কারকাজের অনুমোদনক্ষমতা রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি বা বাপেক্সের পরিচালনা পর্ষদের হাতে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। জামায়াতের মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে প্রয়োজনীয় সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বিলম্বিত হতে পারে। তাই নির্ধারিত সীমার মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

তৃতীয় প্রস্তাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাব্য সময় এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের ট্যারিফ সম্পর্কে জনগণকে স্পষ্ট তথ্য দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় প্রকল্পগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যয়ের বিষয়ে জনগণের কাছে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।

চতুর্থ প্রস্তাবে জরুরি দরপত্র মূল্যায়নের জন্য একটি স্থায়ী মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর জন্য একক তদারকি ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কোন ফাইল কোথায় এবং কত দিন ধরে আটকে আছে, সে বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে জামায়াত। দলটির মতে, প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার জ্বালানি খাতের কয়েকটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের মহেশখালী ও পটুয়াখালীর পায়রায় টার্মিনাল করার পরিকল্পনা ছিল। এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কতদূর এগিয়েছে, তা জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়। একইভাবে খুলনার খালিশপুরে ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলেও সেটি এখনো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।

জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক আমদানি বা সরবরাহ বাড়ানোর ওপর নির্ভর করলে হবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্যাস সরবরাহ, জ্বালানি আমদানি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বক্তব্যে সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও জাতীয় সংকটের সময় দায়িত্বশীল ভূমিকার কথা তুলে ধরেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, দেশের মানুষের দুর্ভোগ কমানোই হওয়া উচিত সবার প্রধান লক্ষ্য। জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই সংকটকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় না বানিয়ে কার্যকর সমাধানের জন্য প্রতিটি পক্ষের প্রস্তাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সরকারপ্রধানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বিরোধীদের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন। বিরোধীরা দীর্ঘ সময় মাঠে ছিল না—এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। দলের নেতাকর্মীদের ওপর বিভিন্ন সময়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও শাস্তির ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের মতপার্থক্যের বিষয়টিও উঠে আসে।

তবে জ্বালানি সংকট নিয়ে জামায়াতের চার দফা প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হিসেবে দলটি প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি আনা, প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনগণের সামনে তথ্য প্রকাশের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে ৯০ দিনের মধ্যে প্রস্তাবগুলোর অগ্রগতি জানাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে দলটি বলেছে, এতে জনগণ সরকারের উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে।

বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের পাশাপাশি পরিবহন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জ্বালানি সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সংকট মোকাবিলায় পৃথক প্রস্তাব আসাকে নীতিগত বিতর্কের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জামায়াতের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সরকার কী পদক্ষেপ নেয় এবং এর অগ্রগতি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকাশ করা হয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের নিজস্ব পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা নিয়েও জনমনে আগ্রহ রয়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যে দ্রুত, স্বচ্ছ ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত