সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া চার্জে জরিমানা, নিবন্ধনে আসছে অটোরিকশা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৭ বার
সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া চার্জে জরিমানা, নিবন্ধনে আসছে অটোরিকশা

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে নিয়মের আওতায় আনতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মাধ্যমে এসব অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে চার্জ করলে জরিমানার বিধান রাখা হচ্ছে। নিবন্ধনের সময় নির্ধারিত শর্ত না মানলে নিবন্ধন দেওয়া হবে না এবং নিবন্ধনের পর নিয়ম ভঙ্গ করলে নবায়নও বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

সোমবার (১৭ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ে আয়োজিত পর্যালোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।

শহর ও মফস্বলের সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছে এসব যান সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম খরচের হওয়ায় এর ব্যবহারও ব্যাপক। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, নিরাপত্তা এবং সড়কে চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে। নতুন নিবন্ধন কাঠামোর মাধ্যমে এসব বিষয়কে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। নিবন্ধনের সময়ই কিছু শর্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। এর মধ্যে অন্যতম হবে অটোরিকশায় ব্যবহৃত ব্যাটারি চার্জের ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার নিশ্চিত করা।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে অটোরিকশা চার্জ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জরিমানার মুখে পড়তে হবে। শুধু নতুন নিবন্ধনের ক্ষেত্রেই নয়, নিবন্ধনের পরও নিয়ম মেনে চলার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। কোনো নিবন্ধিত অটোরিকশা নির্ধারিত শর্ত অমান্য করে সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া অন্য উৎস থেকে চার্জ দিলে পরবর্তী সময়ে তার নিবন্ধন নবায়ন না করার বিধান রাখা হচ্ছে।

এ উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন কাঠামোর আওতায় আনা এবং অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে এসব যানবাহনের বড় একটি অংশ প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে চার্জিং ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, এখন থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএর মাধ্যমে দেওয়া হবে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো এসব যানবাহনের নিবন্ধনের দায়িত্ব পালন করবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে।

তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিবন্ধনের বিষয়ে জাতীয় সংসদে আইন পাস হয়েছে। সেই আইনের আলোকে এখন বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে। বিধিমালায় নিবন্ধনের ফি, নবায়ন ফি এবং নিবন্ধনের অন্যান্য শর্ত নির্ধারণ করা হবে। ফলে কোন ধরনের অটোরিকশা নিবন্ধনের যোগ্য হবে, কী কী কাগজপত্র লাগবে, কত টাকা নিবন্ধন ও নবায়ন ফি দিতে হবে এবং কোন শর্তে নিবন্ধন বাতিল বা নবায়ন বন্ধ হতে পারে—এসব বিষয় বিধিমালায় স্পষ্ট করা হবে।

নিবন্ধন ব্যবস্থার পাশাপাশি অটোরিকশার কারিগরি সক্ষমতার বিষয়েও কঠোর শর্ত আরোপের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নিবন্ধন ও নবায়নের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশার ফিটনেস সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট অথবা জেলা পর্যায়ের সরকারি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের অটোমোবাইল শাখা থেকে ফিটনেস সনদ নিতে হবে।

ফিটনেস পরীক্ষার মাধ্যমে অটোরিকশার কারিগরি নিরাপত্তা ও চলাচলের উপযোগিতা যাচাই করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সনদ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক পুলিশের প্রতিস্বাক্ষরও নিতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সিটি করপোরেশন বা পৌরসভায় জমা দিয়ে নিবন্ধন বা নবায়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

এতে অটোরিকশার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে একাধিক ধাপে যাচাইয়ের ব্যবস্থা তৈরি হবে। শুধু একটি যানবাহন রাস্তায় চলাচলের উপযোগী কি না, সেটিই নয়; সেটি কারিগরিভাবে নিরাপদ কি না এবং নির্ধারিত নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় আসবে। ফলে ভবিষ্যতে অনিয়ন্ত্রিত বা ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের সংখ্যা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে নতুন নিয়ম বাস্তবায়নে অটোরিকশার মালিক ও চালকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস এই যান চালানো। তাই নিবন্ধন, ফিটনেস পরীক্ষা, নবায়ন এবং সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিংয়ের নতুন শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া চার্জ দিলে জরিমানার বিধান কার্যকর করতে হলে পর্যাপ্ত সৌরচার্জিং অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠবে। শুধু নিয়ম নির্ধারণ করলেই হবে না, অটোরিকশা চালক ও মালিকরা যাতে সহজে অনুমোদিত চার্জিং সুবিধা পান, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় নির্ধারিত চার্জিং ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকলে নিয়ম বাস্তবায়নে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।

সরকারের এই উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত যানবাহন চার্জ করার সুযোগ বাড়ানো গেলে প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কিছুটা কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও বাড়তে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে অবকাঠামো, নিয়মিত তদারকি এবং বাস্তবসম্মত বিধিমালা প্রণয়নের ওপর।

অন্যদিকে ফিটনেস সনদ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পুরোনো বা ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন সড়কে চলাচল করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। নির্ধারিত কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে যানবাহনের উপযোগিতা যাচাই করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ অটোরিকশা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ও পরিচয় সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি হতে পারে।

এখন মূল অপেক্ষা বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার। কারণ আইনগত কাঠামোর পাশাপাশি বাস্তবে কীভাবে নিবন্ধন, ফিটনেস পরীক্ষা, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার এবং জরিমানার বিধান কার্যকর হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, চার্জিং অবকাঠামো এবং অটোরিকশা চালকদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিধিমালা তৈরি করা হলে নতুন ব্যবস্থাটি কার্যকর ও টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনার এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি নতুন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবেশ, সড়ক নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর ব্যবস্থাপনা এবং হাজারো চালকের জীবিকার প্রশ্ন। সরকারের নতুন নীতির বাস্তব প্রয়োগে এসব বিষয় কতটা সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে উদ্যোগটির সফলতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত