প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
তরুণ ও কিশোর ব্যবহারকারীদের ক্ষতি করার অভিযোগে বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান আইনি লড়াই এবার আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে করা মামলায় অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে না, তরুণদের জন্য এই দুই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারের ধরনেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
মামলাটিকে মেটার জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আইনি চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এমন কিছু ফিচার, যেগুলো ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখে বলে অভিযোগ করেছে অঙ্গরাজ্যগুলো। ‘লাইক’ সংখ্যা, অনন্ত স্ক্রলিং, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুপারিশ ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও চালু হওয়া এবং ঘন ঘন নোটিফিকেশনের মতো ফিচার তরুণদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।
২০২৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে মেটা ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন আইন লঙ্ঘন করেছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, মেটা তার প্ল্যাটফর্মের সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করেনি এবং তরুণ ব্যবহারকারীদের যত বেশি সময় সম্ভব প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন ফিচার ও অ্যালগরিদম তৈরি করেছে।
মামলায় অঙ্গরাজ্যগুলো মেটার কাছে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। তবে আর্থিক ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি তাদের মূল দাবিগুলোর একটি হলো, শিশু ও কিশোরদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের কার্যপ্রণালিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা। এর ফলে আদালতের রায় মেটার বিরুদ্ধে গেলে ভবিষ্যতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভিজ্ঞতাই বদলে যেতে পারে।
সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনের একটি হতে পারে ‘লাইক’ সংখ্যা প্রদর্শন। বর্তমানে কোনো ছবি, ভিডিও বা পোস্টে কতজন লাইক দিয়েছেন, সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনজীবীদের যুক্তি, কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা সামাজিক তুলনা বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যের পোস্টে বেশি লাইক দেখে নিজের জনপ্রিয়তা বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে হতাশা তৈরি হতে পারে। তাই অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লাইক সংখ্যা গোপন রাখার বিষয়টি মামলায় গুরুত্ব পেয়েছে।
অনন্ত স্ক্রলিং নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে একটি কনটেন্ট দেখার পর ব্যবহারকারী খুব সহজেই পরবর্তী কনটেন্টে চলে যেতে পারেন। এভাবে নির্দিষ্ট কোনো শেষ বিন্দু ছাড়াই ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য পোস্ট দেখা সম্ভব। অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, এই নকশা ব্যবহারকারীদের আরও বেশি সময় অ্যাপের মধ্যে আটকে রাখার জন্য কার্যকর। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ডিজাইন দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
তরুণদের জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুপারিশ অ্যালগরিদম নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ব্যবহারকারী কোন ধরনের ভিডিও বা ছবি বেশি দেখছেন, কোন কনটেন্টে বেশি সময় কাটাচ্ছেন এবং কোন পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্ল্যাটফর্মগুলো পরবর্তী কনটেন্ট সাজায়। অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবি, এই ব্যবস্থা ব্যবহারকারীর আগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কনটেন্ট দেওয়ার পাশাপাশি তাদের আরও বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার কাজও করে। মামলায় এই অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি উঠেছে।
ছবির চেহারা পরিবর্তনকারী বিভিন্ন ফিল্টার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌন্দর্যের নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি এবং নিজের চেহারা নিয়ে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর অবস্থান হলো, তরুণদের জন্য এমন কিছু ফিচার সীমিত করা প্রয়োজন, যেগুলো তাদের আত্মপরিচয় ও শারীরিক চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও চালু হওয়া এবং ঘন ঘন পুশ নোটিফিকেশন পাঠানোর বিষয়টিও মামলায় গুরুত্ব পেয়েছে। একটি ভিডিও শেষ হওয়ার পর ব্যবহারকারীকে আলাদা করে কিছু করতে না দিয়েই নতুন ভিডিও চালু হয়ে যাওয়া কিংবা ফোনে বারবার নতুন কনটেন্টের নোটিফিকেশন আসা ব্যবহারকারীকে আবার অ্যাপে ফিরিয়ে আনতে পারে। অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, তরুণদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকা কঠিন করে তোলে।
মামলায় এমন ব্যবস্থার কথাও উঠে এসেছে, যাতে একজন ব্যবহারকারী একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলতে না পারেন। পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম স্টোরিজের মতো নির্দিষ্ট সময় পর অদৃশ্য হয়ে যায় এমন কনটেন্টের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে বর্তমানে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের পরিচিত ব্যবহারের অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যেতে পারে।
অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন—মেটার ব্যবসায়িক স্বার্থ কি তরুণ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে? তাদের দাবি, যত বেশি সময় ব্যবহারকারী প্ল্যাটফর্মে থাকবেন, তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ তৈরি হবে এবং কোম্পানির ব্যবসা বাড়বে। তাই ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে রাখার মতো ফিচার তৈরি করা মেটার ব্যবসায়িক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মেটা অবশ্য এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে। কোম্পানিটির অবস্থান হলো, তরুণদের নিরাপত্তা ও অনলাইন অভিজ্ঞতা উন্নত করতে তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের মাধ্যমে দেখানো হবে যে তরুণ ব্যবহারকারীদের সহায়তা এবং সুরক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানটি কাজ করেছে।
মামলাটির বিচার ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল আদালতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিচারক ইয়ভন গনজালেজ রজার্স এই মামলার শুনানি করছেন। প্রযুক্তি খাতের আলোচিত মামলাগুলো পরিচালনার অভিজ্ঞতার কারণে তার ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মামলার শুনানিতে মেটার অভ্যন্তরীণ নথি, গবেষণা এবং বিভিন্ন পণ্য নকশা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।
এরই মধ্যে অন্য একটি মামলায় মেটা বড় ধরনের আইনি ধাক্কা খেয়েছে। নিউ মেক্সিকোতে শিশুদের ক্ষতি ও গোপনীয়তা সংক্রান্ত অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়। সেখানে মেটাকে মোট ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং তরুণ ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় প্ল্যাটফর্মে বেশ কিছু পরিবর্তনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
নিউ মেক্সিকোর মামলায় বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড মেটার প্ল্যাটফর্মে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কিছু ফিচার সীমিত করার নির্দেশ দেন। এর মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য লাইক সংখ্যা প্রদর্শন বন্ধ করা, তরুণদের মধ্যে নগ্ন ছবি আদান-প্রদান ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া এবং পুশ নোটিফিকেশনের সময়সীমা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় রয়েছে। মেটা ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে।
নিউ মেক্সিকোর সিদ্ধান্তের প্রভাব অবশ্য অঙ্গরাজ্যটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ৩০টি অঙ্গরাজ্য একযোগে মেটার বিরুদ্ধে জয়ী হলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। কারণ এসব অঙ্গরাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বসবাস করেন। ফলে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে গেলে মেটাকে দেশজুড়ে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নকশা ও নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
এই মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মেটার নিজস্ব গবেষণা। অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনজীবীরা মেটার জমা দেওয়া বিপুলসংখ্যক অভ্যন্তরীণ নথি ও গবেষণা বিশ্লেষণ করছেন। তাদের দাবি, এসব গবেষণার কিছু অংশে সামাজিক তুলনা, একাকীত্ব, নিজের শরীর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা এবং খারাপ মেজাজের সঙ্গে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
তবে গবেষণার ফলাফল কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে এবং সেগুলো সরাসরি মেটার আইনি দায় প্রমাণ করে কি না, সেটিই বিচারপর্বে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক একটি জটিল বিষয়। ব্যবহারকারীর বয়স, পারিবারিক পরিবেশ, ব্যক্তিগত মানসিক অবস্থা, ব্যবহারের সময় এবং কী ধরনের কনটেন্ট দেখা হচ্ছে—সবকিছুই এর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে আদালতের সামনে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, এর প্রভাবের বৈজ্ঞানিক ও আইনি ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
অভিভাবকদের জন্যও মামলাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সন্তান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত সময় কাটাচ্ছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে কিংবা কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এসব নিয়ন্ত্রণ করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। আদালতের সিদ্ধান্ত যদি প্ল্যাটফর্মের নকশায় পরিবর্তন আনে, তাহলে অভিভাবকদের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমে প্রযুক্তিগতভাবেও তরুণদের সুরক্ষার ব্যবস্থা জোরদার হতে পারে।
তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের জন্য শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বন্ধুত্ব, শিক্ষা, সৃজনশীলতা ও যোগাযোগের ক্ষেত্র হিসেবেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করলে তরুণদের স্বাভাবিক অনলাইন যোগাযোগ ও স্বাধীনতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই আদালতের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য তৈরি করা।
শেষ পর্যন্ত মামলার রায় যেদিকেই যাক, এর প্রভাব শুধু মেটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। শিশু ও কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে ডিজাইন করা উচিত, ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার প্রযুক্তি কোথায় সীমা অতিক্রম করে এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায় কতটা—এসব প্রশ্ন ভবিষ্যতের নীতি ও আইন প্রণয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই মেটার বিরুদ্ধে চলমান এই আইনি লড়াইকে শুধু একটি প্রযুক্তি কোম্পানির মামলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের ডিজিটাল নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেল এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় একটি পরীক্ষা। আদালতের সিদ্ধান্ত যদি অঙ্গরাজ্যগুলোর পক্ষে যায়, তাহলে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর পরিচিত ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের অভিজ্ঞতাতেই হয়তো শুরু হবে বড় পরিবর্তন।