সিলেট সীমান্তে ভারতে পাচারের চেষ্টায় ৮ রোহিঙ্গাসহ আটক ১২

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার
সিলেট সীমান্তে ভারতে পাচারের চেষ্টায় ৮ রোহিঙ্গাসহ আটক ১২

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের চেষ্টার অভিযোগে আট রোহিঙ্গাসহ ১২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। সোমবার বিকেলে উপজেলার দিঘিরপাড় ইউনিয়নের সুরমা নদীর কুওরেরমাটি বটরবাজার এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় তাঁদের আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, আটক রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-১-এর বাসিন্দা। তাঁদের ভারতে পাঠানোর জন্য একটি সংঘবদ্ধ চক্র সীমান্ত এলাকায় যাতায়াত ও নৌযানের ব্যবস্থা করেছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ওই আটজনকে প্রথমে সিলেট নগরের কদমতলী এলাকায় নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাঁদের কানাইঘাট সীমান্তের দিকে নেওয়া হচ্ছিল। পরিকল্পনা ছিল কানাইঘাটের দনা সীমান্ত দিয়ে তাঁদের ভারতে পাঠানোর। এ জন্য সুরমা নদীর কুওরেরমাটি বটরবাজার এলাকায় আগে থেকেই একটি নৌকা প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তবে সীমান্তপথে যাওয়ার আগেই পরিকল্পনায় ছন্দপতন ঘটে। অটোরিকশায় করে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসতে দেরি হওয়ায় নৌকার মাঝির সঙ্গে কথিত দালালদের একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ হয়। বিষয়টি স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার নজরে আসে। তাঁদের সন্দেহ হলে কুওরেরমাটি মাদ্রাসার সামনে দুটি অটোরিকশা থামিয়ে যাত্রীদের পরিচয় ও সেখানে আসার কারণ জানতে চাওয়া হয়। একপর্যায়ে কথাবার্তায় ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনার বিষয়টি সামনে আসে। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে রোহিঙ্গাসহ ১২ জনকে আটক করে।

আটক চার বাংলাদেশির মধ্যে দুজনকে পাচারকারী চক্রের সদস্য হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁরা হলেন কানাইঘাটের এরালীগুল গ্রামের আছাদ, বয়স ২২ বছর, এবং বড়খেরড় গ্রামের সাদ্দাম হোসেন, বয়স ২২ বছর। অন্য দুজন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। তাঁদের একজন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার রফিক, বয়স ৬৫ বছর, এবং অপরজন নেত্রকোনার এলাছ উদ্দিন, বয়স ৪৪ বছর।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অটোরিকশা দুটি ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে নৌপথে তাঁদের সীমান্তের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। দনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতেই নৌকা প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কানাইঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আটক রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প থেকে বের হয়ে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে এই ঘটনার পেছনে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে।

সীমান্তপথে রোহিঙ্গাদের অনিয়মিত চলাচল ও পাচারের চেষ্টা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন উদ্বেগ নয়। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলো থেকে বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার এবং পরে সীমান্ত ব্যবহার করে অন্য দেশে পাঠানোর চেষ্টা ধরা পড়েছে। বিশেষ করে উন্নত জীবনের আশায় অনেকে দালালদের প্রলোভনে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বেরিয়ে পড়েন। এ ধরনের যাত্রায় একদিকে যেমন অর্থনৈতিক প্রতারণার ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে সীমান্তপথে আটক, নিখোঁজ হওয়া কিংবা মানবপাচারের শিকার হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

সিলেটের ভৌগোলিক অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, পাহাড়ি ও নদীঘেরা বিভিন্ন এলাকা এবং দুর্গম পথের কারণে কিছু অংশে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা হয়ে থাকে। কানাইঘাটের দনা সীমান্তও এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকা। সীমান্তের কাছাকাছি নদীপথ ব্যবহার করে অবৈধভাবে মানুষ পারাপারের চেষ্টা হলে তা শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ভূমিকা বিশেষভাবে সামনে এসেছে। অটোরিকশায় অপরিচিত ব্যক্তিদের চলাচল এবং নৌকার মাঝির সঙ্গে ঘন ঘন ফোনালাপ স্থানীয়দের সন্দেহের কারণ হয়। তাঁরা বিষয়টি উপেক্ষা না করে অটোরিকশা দুটি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের আটক করে। সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থানীয় মানুষের সতর্কতা যে অবৈধ পারাপার ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, এ ঘটনা তার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

তবে মানবপাচারের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু সীমান্তে অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। দালালচক্র সাধারণত বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগের নেটওয়ার্ক তৈরি করে রাখে। ক্যাম্প থেকে লোক সংগ্রহ, পরিবহন ব্যবস্থা, সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে দেওয়া এবং সীমান্ত পার করার জন্য স্থানীয় সহযোগী সংগ্রহ—পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে। ফলে আটকের পর শুধু ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পুরো চক্রের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা জরুরি।

এই ঘটনায় পুলিশও পাচারকারী চক্রের অন্য সদস্যদের বিষয়ে তদন্তের কথা জানিয়েছে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁদের সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিল, রোহিঙ্গাদের যাত্রার অর্থ কে দিয়েছিল, কোথা থেকে তাঁদের সিলেটে আনা হয়েছিল এবং সীমান্তের ওপারে কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল—এসব তথ্য বের করার চেষ্টা করা হতে পারে। তদন্তে নতুন কোনো নাম বা তথ্য পাওয়া গেলে ঘটনার পরিধিও বাড়তে পারে।

রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ক্যাম্পের সীমাবদ্ধ জীবন, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এবং উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে দালালচক্র অনেক সময় তাদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় প্রলুব্ধ করে। কেউ কেউ কাজ, অর্থ বা বিদেশে নিরাপদ জীবনের আশ্বাসে এসব চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

কিন্তু বৈধ কাগজপত্র ছাড়া সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা তাঁদের আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারে। বিশেষ করে মানবপাচারকারীদের হাতে পড়লে তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা, অর্থ আদায় কিংবা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই ক্যাম্প থেকে অনিয়মিতভাবে বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকানোর পাশাপাশি দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

সিলেট সীমান্তে আটজন রোহিঙ্গাসহ ১২ জন আটকের ঘটনায় এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এই যাত্রার পেছনের পুরো নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা। কারা তাঁদের কক্সবাজার থেকে সিলেটে নিয়ে এসেছে, পরিবহনের ব্যবস্থা কারা করেছে, সীমান্তে নৌকা কে প্রস্তুত রেখেছিল এবং ভারতে পৌঁছানোর পর তাঁদের কোথায় নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই পাচারচক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

এদিকে আটক রোহিঙ্গাদের আইনগত ও মানবিক বিষয়টিও যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে যদি সীমান্ত আইন বা অন্য কোনো আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁরা যাতে আবার কোনো পাচারচক্রের হাতে না পড়েন, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে।

সোমবারের ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত সীমান্ত পারাপারের আগেই ধরা পড়েছে। তবে এর মধ্য দিয়ে সিলেট সীমান্তকে ব্যবহার করে মানবপাচারের সম্ভাব্য নেটওয়ার্কের একটি চিত্র সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্কতা, পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ এবং পরবর্তী তদন্ত—এই তিনটি বিষয় এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু ১২ জনকে আটক করেই যেন তদন্ত থেমে না যায়; বরং তাঁদের পেছনে থাকা পুরো চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা গেলে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পাচারের পথ বন্ধে কার্যকর বার্তা যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত