প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে মাত্র ১৪ দিন বয়সী এক নবজাতকের মরদেহ পানিভর্তি প্লাস্টিকের ড্রাম থেকে উদ্ধারের ঘটনায় তার মাকে আটক করেছে পুলিশ। সোমবার রাতে মীরওয়ারিশপুর ইউনিয়নের মজুমদারহাট এলাকায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিশুটির মা ফাতেমা বেগম সন্তানকে পানিতে চুবিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মজুমদারহাট এলাকার বাসিন্দা সৌরভ হোসেন ও ফাতেমা বেগমের ঘরে ৪ আগস্ট একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। জন্মের পর থেকে শিশুটি পরিবারের সঙ্গেই ছিল। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যার পর হঠাৎ করে শিশুটিকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে শিশুটির মা ফাতেমার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি পরস্পরবিরোধী কথা বলতে থাকেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফাতেমা প্রথমে দাবি করেন, তাঁর মাথায় আঘাত করে কেউ শিশুটিকে নিয়ে গেছে। পরে তিনি বলেন, শিশুটিকে ‘জিন’ নিয়ে গেছে। তাঁর কথাবার্তায় অসংগতি দেখা দিলে পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ বাড়ে। এরপর বাড়ির আশপাশে তল্লাশি শুরু করা হয়। একপর্যায়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রাখা একটি প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর শিশুটির মরদেহ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। পরে শিশুটির মাকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফাতেমা সন্তানকে পানিতে ফেলে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নবজাতকটি সারাক্ষণ কান্নাকাটি করত এবং এতে তিনি ঘুমাতে পারতেন না। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি শিশুটিকে পানিতে চুবিয়ে দেন বলে পুলিশকে জানিয়েছেন।
তবে পুলিশের কাছে দেওয়া এই বক্তব্যই ঘটনার চূড়ান্ত সত্য—এমনটি এখনই ধরে নেওয়া হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নবজাতকের মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করতে মরদেহের ময়নাতদন্তসহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। একই সঙ্গে শিশুটির মায়ের বক্তব্য, পরিবারের সদস্যদের তথ্য এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতিও তদন্তের আওতায় নেওয়া হচ্ছে।
বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শামসুজ্জামান জানিয়েছেন, নবজাতককে পানিতে ফেলে হত্যার অভিযোগে তার মাকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ঘটনাটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর এভাবে মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। পরিবারের কাছে যে শিশুটি ছিল আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু, তার আকস্মিক মৃত্যু পুরো পরিবারকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে শিশুটির মায়ের আচরণ এবং ঘটনার পেছনের কারণ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ফাতেমা বেগমের সঙ্গে সৌরভ হোসেনের বিয়ে হয় গত বছরের নভেম্বরে। চলতি বছরের ৪ আগস্ট তাঁদের সন্তান জন্ম নেয়। অর্থাৎ জন্মের মাত্র ১৪ দিনের মাথায় শিশুটির মৃত্যু হলো। এত অল্প বয়সী একটি শিশুকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি যত্ন ও নজরদারি থাকার কথা। কিন্তু সন্ধ্যার পর শিশুটিকে না পাওয়া এবং পরে বাড়ির ভেতরেই পানিভর্তি ড্রামে মরদেহ পাওয়ার ঘটনায় বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে।
ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিশুটিকে নিখোঁজ দেখানোর জন্য প্রথমে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ। পুলিশ বলছে, ফাতেমার বক্তব্যে অসংগতি থাকায় পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ তৈরি হয় এবং তার পরই অনুসন্ধানে শিশুটির মরদেহ পাওয়া যায়। ফলে ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে তদন্তকারী দল।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্যকে তদন্তের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আদালতে অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য তদন্ত-তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শিশুটির মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের সব ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন।
এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, সমাজের জন্যও বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়। নবজাতক ও প্রসূতি মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবারকে যেমন সচেতন থাকতে হয়, তেমনি সন্তান জন্মের পর মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। সন্তান জন্মের পর ঘুমের ঘাটতি, অতিরিক্ত ক্লান্তি, উদ্বেগ কিংবা তীব্র মানসিক চাপ অনেক মায়ের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এসব ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বেগমগঞ্জের এই ঘটনার ক্ষেত্রে ফাতেমার মানসিক বা শারীরিক কোনো বিশেষ পরিস্থিতি ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাই অনুমাননির্ভর কোনো সিদ্ধান্তে না গিয়ে তদন্তের ফলের জন্য অপেক্ষা করাই যুক্তিসংগত। পুলিশও ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।
এদিকে নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা বা লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ভূমিকা এবং দায় সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
মাত্র ১৪ দিনের জীবনের এই করুণ পরিণতি তাই এখন শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; এটি নবজাতকের নিরাপত্তা, প্রসূতি মায়ের মানসিক সুস্থতা এবং পারিবারিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন সামনে এনেছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই এখন সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।