ভোট থেকে ফল ঘোষণা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যেভাবে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
ভোট থেকে ফল ঘোষণা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যেভাবে

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

৩৫ বছর পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। তবে সব সংসদ সদস্য নির্ধারিত সময়ের আগেই ভোট দিয়ে ফেললে ভোটগ্রহণ শেষ করে গণনার কাজও আগে শুরু করা যেতে পারে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর একই সংসদকক্ষেই ব্যালট গণনা করা হবে এবং প্রক্রিয়া শেষ হলে ফল ঘোষণা করা হবে। এরপর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন।

এবারের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে মূলত দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকায়। ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের প্রয়োজন পড়েনি। দীর্ঘ সময় একক প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে সাড়ে তিন দশক পর সংসদকক্ষে আবারও ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। সংসদে দুই পক্ষের আসনসংখ্যার ব্যবধান অনেক বেশি হওয়ায় ভোটের ফল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগে থেকেই নানা হিসাব-নিকাশ রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ভোটগ্রহণ, ব্যালট যাচাই ও গণনার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মোট আসন ৩৫০টি হলেও একটি সাধারণ আসনে প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ জনে। সংসদ সদস্যদের এই ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের মতো নয়। সংসদকক্ষে প্রবেশের সময় প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে সংসদ সচিবালয় থেকে সরবরাহ করা পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে। নিজ নিজ আসনে বসার পর তারা সহকারী নির্বাচনী কর্মকর্তার কাছ থেকে নাম ও নির্বাচনী সংখ্যা-সংবলিত ব্যালট পেপার সংগ্রহ করবেন। এরপর ব্যালট পেপারের কাউন্টার ফয়েল বা চেকমুড়িতে নির্ধারিত স্থানে নিজের পূর্ণ নাম লিখে সেটি সহকারী নির্বাচনী কর্মকর্তার কাছে ফেরত দিতে হবে।

এরপর সংসদ সদস্য ব্যালট পেপারের নির্ধারিত অংশে পছন্দের প্রার্থীর নামের বিপরীতে নিজের পূর্ণ নাম লিখে ভোট দেবেন। ভোট দেওয়া শেষ হলে ব্যালট পেপার সংসদকক্ষে স্থাপিত নির্ধারিত ব্যালট বাক্সে জমা দিতে হবে। ভোট দেওয়ার সময় কোনো ব্যালট পেপার লেখার ক্ষেত্রে ভুল হলে বা সেটি নষ্ট হয়ে গেলে তা সরাসরি ব্যালট বাক্সে না দিয়ে নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। পরে নির্বাচন কর্মকর্তা বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

ভোটকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়েও রয়েছে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ। ভোটগ্রহণ চলাকালে সংসদ সদস্যদের বৈঠকে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচার চালানো যাবে না। একইভাবে সেখানে কোনো বক্তব্য বা ভাষণ দেওয়ার সুযোগও থাকবে না। ভোট দেওয়ার সময় কোনো সংসদ সদস্য সমস্যায় পড়লে চিফ হুইপ ও বিরোধী দলের চিফ হুইপের সহায়তা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালটে ভোটারের পূর্ণ স্বাক্ষরের কথা উল্লেখ থাকলেও সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষরের পরিবর্তে পূর্ণ নাম লিখতে হবে। ফলে ব্যালটের প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যালটের বৈধতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্বাচনী বিধিমালা ও কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করা হবে।

এবারের নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সংসদ সদস্যদের দলীয় অবস্থান। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও এই বিধান কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মণি। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টিও ভোটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভোটগ্রহণ শেষে শুরু হবে গণনার আনুষ্ঠানিকতা। প্রথমে নির্বাচনী কর্মকর্তারা হিসাব করবেন মোট কতজন সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন। এরপর কতটি ব্যালট বৈধ, কতটি বাতিল এবং কতটি ব্যালট অব্যবহৃত রয়েছে, তা নির্ধারণ করা হবে। বৈধ ব্যালট আলাদা করার পর প্রতিটি প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন, সেটি গণনা করা হবে। গণনার পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সর্বাধিক বৈধ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করবেন নির্বাচন কর্মকর্তা।

এ ক্ষেত্রে ভোটের ফল নির্ধারণে সংসদ সদস্যদের দেওয়া বৈধ ভোটই মূল বিবেচ্য হবে। কোনো ব্যালট নিয়মবহির্ভূতভাবে পূরণ করা হলে সেটি বাতিল হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাই ভোট দেওয়ার সময় ব্যালট পেপারে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা এবং নিজের পূর্ণ নাম সঠিকভাবে লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফল ঘোষণার পর নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে না। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করবে। এর মাধ্যমে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হবে।

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের আয়োজন হওয়ায় এবারের নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও রয়েছে আলাদা আগ্রহ। যদিও ভোটার হিসেবে সাধারণ নাগরিকরা সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না, তবু সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন ব্যক্তির দায়িত্ব গ্রহণ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। সংসদকক্ষে ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে ব্যালট গণনা ও ফল ঘোষণা—প্রতিটি ধাপই তাই আজকের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

সব ভোট নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হলে গণনাও আগে শুরু হতে পারে। আর নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চললে বিকেল ৫টার পরপরই গণনার প্রস্তুতি নেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত বৈধ ভোটে কে এগিয়ে থাকেন, সেটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে কে বঙ্গভবনের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। দীর্ঘ বিরতির পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচন তাই শুধু একটি সাংবিধানিক পদে নতুন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও পুনরাবৃত্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত