রাকসুর তহবিলে সোয়া কোটি, ভাউচার নেই ৬১ লাখের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার
রাকসুর তহবিলে সোয়া কোটি, ভাউচার নেই ৬১ লাখের

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—রাকসুর তহবিল পরিচালনায় ব্যয় ও হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চলতি মেয়াদে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য রাকসুর তহবিল থেকে ৪২টি খাতে মোট ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার বিল-ভাউচার এখনো জমা পড়েনি বলে রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের ব্যয়সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি অর্থ নিয়েছেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার। সাত ধাপে তাঁর নামে বরাদ্দ হয়েছে ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকার বিল-ভাউচার জমা দেওয়া হলেও ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার খরচের হিসাব এখনো জমা হয়নি। ফলে রাকসুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, এসব অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন কর্মসূচির বিল-ভাউচার প্রস্তুত ও সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় কিছু হিসাব জমা দিতে দেরি হয়েছে। রাকসু কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, বাকি থাকা বিল-ভাউচার নিয়ম মেনে জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে।

জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের ক্ষেত্রে তিন ধাপে বড় অঙ্কের হিসাব জমা না দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ভর্তি পরীক্ষার সময় বুথ স্থাপনের জন্য ৩ লাখ ২ হাজার টাকা, একই মাসে রাকসু সদস্যদের বাজেট বাবদ ১৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা এবং এপ্রিলে রাকসু সদস্যদের দাপ্তরিক খরচের জন্য ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।

আম্মারের ভাষ্য, ভর্তি পরীক্ষার সময় হওয়া ব্যয়ের সঙ্গে ভ্যাট যুক্ত হওয়ার বিষয়টি আগে জানা না থাকায় হিসাব সমন্বয়ে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সদস্যদের সম্মিলিত বাজেটের একজনের হিসাব না পাওয়ায় পুরো বাজেটের ভাউচার জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁর দাবি, এরই মধ্যে একটি হিসাব জমা দেওয়া হয়েছে এবং বাকি হিসাবও সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জিএসের পর রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদের নামে ওঠানো অর্থের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। ছয় ধাপে তাঁর নামে মোট ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৩২৪ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে ৯৯ হাজার ৯২৪ টাকার ভাউচার জমা পড়েছে। অর্থাৎ ১২ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ টাকার হিসাব এখনো জমা হয়নি।

নথি অনুযায়ী, গত এপ্রিলে দাপ্তরিক খরচের জন্য দেড় লাখ টাকা নেওয়ার পর ওই ব্যয়ের হিসাব জমা না দিয়েই জুলাইয়ে একই ধরনের খাতে আরও ২ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আগস্টে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখানোর আয়োজনের জন্য ৩ লাখ ৮২ হাজার ৪০০ টাকা, ভিক্টরি রান ইয়ুথ রাকসুর জন্য ৩ লাখ টাকা এবং জুলাই জাদুঘর স্থাপনের জন্য ২ লাখ ৮ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।

ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ অবশ্য জানিয়েছেন, বিল-ভাউচার দ্রুত জমা দেওয়া ভালো হলেও অডিটের আগে তাঁর মেয়াদের মধ্যে সেগুলো জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই তিনি বাকি হিসাব জমা দেবেন বলে জানিয়েছেন। বর্তমান রাকসুর মেয়াদ আগামী ১৫ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা।

শুধু জিএস ও ভিপি নন, রাকসুর আরও কয়েকজন নির্বাচিত প্রতিনিধির নামও বিল-ভাউচার জমা না দেওয়ার তালিকায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ক্রীড়া সম্পাদক মোছা. নার্গিস খাতুনের নামে সাত ধাপে ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৬২৬ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ১২৬ টাকার ভাউচার এখনো জমা হয়নি। রাকসু গেমসের জন্য নেওয়া অর্থের একটি বড় অংশ এর মধ্যে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির কিছু ইভেন্ট এখনো চলমান থাকায় সব হিসাব চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

বিতর্ক ও সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক ইমরান লস্করের নামেও ছয় ধাপে ৮ লাখ ৪২ হাজার ৭৬৫ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ধাপের ব্যয়ের ভাউচার জমা হয়নি। তাঁর বক্তব্য, বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচির বাজেট বাস্তবায়ন করতে হওয়ায় বিল প্রস্তুত ও জমা দিতে সময় লেগেছে। বাকি কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পর দ্রুত জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক জাহিদ হোসেন জোহার নামে তিন ধাপে ৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা নেওয়া হলেও একটি কর্মসূচির ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তাঁর দাবি, তাঁর সব কর্মসূচির বিল-ভাউচার জমা পড়েছে এবং তথ্য সংগ্রহের সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির পার্থক্য থাকতে পারে।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বিএম নাজমুল সাকিবের নামে তিন ধাপে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি ধাপের ৩ লাখ ১০ হাজার টাকার ভাউচার জমা হয়নি। তিনি জানিয়েছেন, সর্বশেষ বাজেটের অর্থ দিয়ে একটি শিক্ষা সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট হিসাব দ্রুত জমা দেওয়া হবে।

মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুজাহিদ ইসলামের নামে তিন ধাপে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৪৮ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এক ধাপের ১ লাখ টাকার ভাউচার জমা হয়নি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সায়িদা হাফসার দুই ধাপে ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৭৬ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তা মেলা বাবদ ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার হিসাব জমা হয়নি। তাঁর বক্তব্য, মেলার সঙ্গে ফটো কনটেস্ট আয়োজনের পরিকল্পনা থাকায় বিলটি তখন জমা দেওয়া হয়নি এবং পরে তা জমা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ তোফার নামে দুই ধাপে ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে নেপালে শিক্ষাবিষয়ক একটি সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্য নেওয়া ৩৭ হাজার ৫০০ টাকার ভাউচার জমা হয়নি। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে উপাচার্যের কাছে সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলেন এবং অর্থটি রাকসুর তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে—এটি তিনি আগে জানতেন না।

পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদের একটি সেমিনারের জন্য নেওয়া ৮২ হাজার টাকার ভাউচারও জমা হয়নি। তিনি জানিয়েছেন, কর্মসূচির পর অব্যবহৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ভাউচারও দ্রুত জমা দেবেন।

রাকসুর এজিএস এসএম সালমান সাব্বিরের নামেও হিসাব না দেওয়া অর্থ রয়েছে। তিনি ৫ মার্চ দাপ্তরিক খরচ বাবদ ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার পাশাপাশি এর আগে কম্পিউটার প্রিন্টার কেনার জন্য নেওয়া ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫০ টাকার হিসাবও জমা দেননি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান জানিয়েছেন, কোনো কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিল-ভাউচার জমা দেওয়া উচিত। যেসব বিল এখনো জমা হয়নি, সেগুলো নিয়ম মেনে জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, রাকসুর অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে হিসাব সংরক্ষণ ও নিরীক্ষার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।

এদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থের ভাউচার জমা না পড়ায় রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা। তাঁদের মতে, রাকসুর অর্থ মূলত শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে ব্যয়ের জন্য। তাই প্রতিটি টাকা কোথায়, কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যয় হয়েছে, তার স্বচ্ছ হিসাব থাকা জরুরি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, রাকসুর তহবিলে থাকা অর্থ শিক্ষার্থীদের চাঁদা থেকে আসে। ফলে এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের সম্পর্ক রয়েছে। এই অর্থ ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুলও ব্যয়ের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আল শাহরিয়ারও রাকসু প্রতিনিধিদের আর্থিক কর্মকাণ্ডে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

তিন যুগের বেশি সময় পর রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ছাত্র সংসদকে ঘিরে ছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। দীর্ঘ বিরতির পর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের আশা ছিল, রাকসু ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সেই জায়গায় বিপুল পরিমাণ অর্থের ভাউচার জমা না পড়ার তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ব্যয় করলে অবশ্যই বিল-ভাউচার জমা দিতে হবে এবং রাকসুকেও এই নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি সভায় হিসাবের স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিষয়ে তিনি তাগিদ দিয়েছেন। রাকসুর প্রতিনিধিরা হিসাব সম্পন্ন করার জন্য কিছু সময় চেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং ভাউচার জমা না দেওয়ার বিষয় দুটি এক নয়—এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যয়ের ভাউচার দেরিতে জমা পড়া মানেই অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া নয়। তবে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পর দীর্ঘ সময় হিসাব না দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই জবাবদিহির প্রশ্ন ওঠে। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রতিটি ব্যয়ের যথাযথ কাগজপত্র, অনুমোদন, ভাউচার এবং অব্যবহৃত অর্থ ফেরতের হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।

রাকসুর বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এসব হিসাব পুরোপুরি নিষ্পত্তি করা হলে বিতর্কের অনেকটাই অবসান হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রতিটি কর্মসূচির পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিল-ভাউচার জমা দেওয়ার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা, নিয়মিত অডিট এবং শিক্ষার্থীদের কাছে ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করা গেলে রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আস্থা বাড়বে। কারণ শিক্ষার্থীদের অর্থে পরিচালিত একটি ছাত্র সংসদের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার নির্বাচিত নেতৃত্ব নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত