হাবলের তথ্যে মিলল মিল্কিওয়ের প্রাচীন সংঘর্ষের প্রমাণ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৫ বার
হাবলের তথ্যে মিলল মিল্কিওয়ের প্রাচীন সংঘর্ষের প্রমাণ

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানবসভ্যতার অস্তিত্বের বহু বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্বে শুরু হয়েছিল গ্যালাক্সি গঠনের এক দীর্ঘ ও জটিল অধ্যায়। সেই অধ্যায়েরই অংশ হিসেবে আমাদের আবাসস্থল মিল্কিওয়ে ধীরে ধীরে বর্তমানের বিশাল সর্পিল গ্যালাক্সিতে পরিণত হয়েছে। এতদিন বিজ্ঞানীরা জানতেন, ছোট ছোট গ্যালাক্সির সঙ্গে সংঘর্ষ ও একীভবন মিল্কিওয়ের বেড়ে ওঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এবার নাসার হাবল মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার গাইয়া অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ করে সেই ইতিহাসের আরও পুরোনো একটি অধ্যায়ের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে, প্রায় ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে তরুণ মিল্কিওয়ে একটি অপেক্ষাকৃত ছোট গ্যালাক্সিকে নিজের সঙ্গে একীভূত করেছিল।

গবেষকদের কাছে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু একটি প্রাচীন মহাজাগতিক সংঘর্ষ শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে মিল্কিওয়ের জন্ম ও বিকাশের সময়রেখা আগের ধারণার তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর পেছনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। গবেষণাটি ১৭ আগস্ট ২০২৬ সালে ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন ইতালির বোলোনিয়ার অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অ্যান্ড স্পেস সায়েন্স অবজারভেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী দাভিদে মাসসারি।

বর্তমানে মিল্কিওয়ে একটি বিশাল সর্পিল গ্যালাক্সি, যেখানে শত শত বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে। এই গ্যালাক্সিরই একটি অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি অঞ্চলে পৃথিবী ও আমাদের সৌরজগতের অবস্থান। কিন্তু আজকের এই বিশাল কাঠামো শুরু থেকেই এমন ছিল না। মহাবিস্ফোরণের পর মহাবিশ্ব যখন তুলনামূলকভাবে তরুণ, তখন গ্যালাক্সিগুলো ছিল ছোট, অপরিণত এবং পরস্পরের সঙ্গে ঘন ঘন মহাজাগতিক মিথস্ক্রিয়ায় যুক্ত। গ্যাস, নক্ষত্র, অদৃশ্য পদার্থ এবং মহাকর্ষের পারস্পরিক প্রভাবে এসব ছোট গ্যালাক্সি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্রমে বড় গ্যালাক্সি তৈরি করেছে। মিল্কিওয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করেছে বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে মনে করে আসছেন।

নতুন গবেষণায় যে গ্যালাক্সিটির সন্ধান পাওয়া গেছে, সেটিকে বিজ্ঞানীরা ‘লো-এনার্জি-ক্রাকেন-হেরাক্লিস’ বা সংক্ষেপে এলকেএইচ নামে চিহ্নিত করেছেন। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, মিল্কিওয়ের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সময় এলকেএইচে থাকা নক্ষত্রগুলোর মোট ভর ছিল প্রায় ৫০ কোটি সূর্যের সমান। অর্থাৎ এটি আজকের মিল্কিওয়ের তুলনায় ছোট হলেও তরুণ মিল্কিওয়ের জন্য ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাজাগতিক সঙ্গী। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই একীভবন ঘটেছিল গাইয়া-সসেজ-এনসেলাডাস নামে পরিচিত আরেকটি বড় একীভবনের প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে।

এই প্রাচীন সংঘর্ষের রহস্য উন্মোচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে মিল্কিওয়ের প্রাচীন নক্ষত্রগুচ্ছ বা গ্লোবুলার ক্লাস্টার। এগুলো হলো বিপুলসংখ্যক পুরোনো নক্ষত্রের ঘন সমষ্টি, যেগুলো একই সময়ের কাছাকাছি গঠিত হয়েছিল। তাদের বয়স, রাসায়নিক গঠন এবং মহাকাশে চলাচলের ধরন বিশ্লেষণ করলে বিজ্ঞানীরা গ্যালাক্সির বহু পুরোনো ইতিহাসের সূত্র খুঁজে পেতে পারেন। গবেষকেরা মিল্কিওয়ের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ হাজার আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা ৩৯টি গ্লোবুলার ক্লাস্টারের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। হাবলের অত্যন্ত উচ্চমানের পর্যবেক্ষণ এবং গাইয়া মিশনের নক্ষত্রের গতি ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য একত্র করার মাধ্যমে এই বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় নক্ষত্রগুচ্ছগুলোর বয়স ও ‘ধাতবতা’ বা ভারী মৌলের উপস্থিতির মাত্রা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মহাজাগতিক বিজ্ঞানে ধাতবতা বলতে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছাড়া অন্যান্য মৌলের পরিমাণ বোঝানো হয়। একটি নক্ষত্র কখন এবং কোন পরিবেশে তৈরি হয়েছে, তার রাসায়নিক গঠনে সেই সময়ের মহাবিশ্বের ইতিহাসের ছাপ থাকতে পারে। গবেষকেরা এই তথ্যের পাশাপাশি নক্ষত্রগুচ্ছগুলোর গতিশীল বৈশিষ্ট্যও বিবেচনা করেন। এর ফলে তারা তিনটি আলাদা বয়স-ধাতবতা ধারার অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম হন।

প্রথম ধারাটি ছিল মিল্কিওয়ের নিজস্ব প্রাথমিক গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত নক্ষত্রগুচ্ছের। দ্বিতীয় ধারাটি প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর আগে ঘটে যাওয়া গাইয়া-সসেজ-এনসেলাডাস একীভবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর তৃতীয় ধারাটিই গবেষকদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহী করে তোলে। এই নক্ষত্রগুচ্ছগুলোর বৈশিষ্ট্য এমন ছিল যে সেগুলোকে মিল্কিওয়ের নিজস্ব প্রাথমিক নক্ষত্র বা পরবর্তী গাইয়া-সসেজ-এনসেলাডাস সংঘর্ষের অংশ হিসেবে সহজে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না। গবেষকেরা শেষ পর্যন্ত এগুলোকে এলকেএইচের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে শনাক্ত করেন।

এর অর্থ হলো, আজকের মিল্কিওয়ের ভেতরে থাকা কিছু অত্যন্ত পুরোনো নক্ষত্র আসলে আমাদের গ্যালাক্সিতে জন্ম নেয়নি। তারা একসময় অন্য একটি গ্যালাক্সির অংশ ছিল। প্রায় ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে এলকেএইচ মিল্কিওয়ের সঙ্গে মিশে যাওয়ার পর ওই নক্ষত্রগুচ্ছগুলোও মিল্কিওয়ের অংশ হয়ে যায়। সেই অর্থে মিল্কিওয়ের ইতিহাস শুধু নিজের ভেতরে নক্ষত্র জন্ম দেওয়ার ইতিহাস নয়; বরং অন্য গ্যালাক্সির উপাদান গ্রহণ করে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার ইতিহাসও।

এই একীভবনের সময় মহাবিশ্বের বয়স ছিল আজকের বয়সের ১৫ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ মহাবিস্ফোরণের প্রায় দুই বিলিয়ন বছর পরের এক সময়ের ঘটনা এটি। তখন মিল্কিওয়ে ছিল আজকের তুলনায় অনেক ছোট এবং তার গঠনও ছিল অপেক্ষাকৃত অপরিণত। এমন অবস্থায় প্রায় ৫০ কোটি সূর্যের সমান নাক্ষত্রিক ভরের একটি গ্যালাক্সি তার সঙ্গে যুক্ত হওয়া মিল্কিওয়ের বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। সংঘর্ষের সময় দুই গ্যালাক্সির গ্যাস মিশে নতুন নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত হয়ে থাকতে পারে।

এর আগে মিল্কিওয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন একীভবনগুলোর একটি হিসেবে গাইয়া-সসেজ-এনসেলাডাস ঘটনাকে বিবেচনা করা হতো। প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই সংঘর্ষ মিল্কিওয়ের কাঠামো এবং নক্ষত্র গঠনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। নতুন গবেষণায় তারও আগে একটি বড় একীভবনের প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় মিল্কিওয়ের প্রাথমিক বিকাশ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা আরও বিস্তৃত হলো।

গবেষণাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি দেখাচ্ছে যে গ্যালাক্সির শৈশবের ইতিহাস পুনর্গঠন করতে শুধু নক্ষত্রের অবস্থান বা গতি জানা যথেষ্ট নয়। তাদের বয়স এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হাবলের নির্ভুল পর্যবেক্ষণ এবং গাইয়ার বিস্তৃত নাক্ষত্রিক তথ্য একত্রে ব্যবহার করেই গবেষকেরা এমন একটি প্রাচীন ঘটনা শনাক্ত করতে পেরেছেন, যার সরাসরি দৃশ্যমান চিহ্ন বহু আগেই হারিয়ে গেছে। মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া ও সময়ের প্রবাহে পুরোনো নক্ষত্রগুলোর অনেক গতিশীল বৈশিষ্ট্য বদলে গেলেও তাদের বয়স ও রাসায়নিক গঠনের মধ্যে অতীতের কিছু স্মৃতি রয়ে যেতে পারে।

তবে বিজ্ঞানীরা এটিকে মিল্কিওয়ের প্রাথমিক ইতিহাসের সম্পূর্ণ চিত্র হিসেবে দেখছেন না। গবেষণায় শনাক্ত হওয়া এলকেএইচ একীভবন একটি বড় ঘটনার প্রমাণ দিলেও এর অর্থ এই নয় যে সেই সময় মিল্কিওয়ের সঙ্গে আর কোনো ছোট গ্যালাক্সির যোগাযোগ ছিল না। যেসব ছোট গ্যালাক্সিতে গ্লোবুলার ক্লাস্টার ছিল না, যেগুলোর নক্ষত্র ইতিমধ্যে পুরোপুরি ছড়িয়ে গেছে কিংবা যেসব ক্ষুদ্র একীভবনের চিহ্ন বর্তমান পর্যবেক্ষণে আলাদা করে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, সেগুলোর অস্তিত্বও থাকতে পারে।

মিল্কিওয়ের এই প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্বেরও একটি পরোক্ষ যোগ রয়েছে। আমাদের সূর্য ও পৃথিবী তৈরি হয়েছে বহু বিলিয়ন বছর পরে। কিন্তু যে গ্যালাক্সির ভেতরে সৌরজগতের জন্ম, সেই গ্যালাক্সির কাঠামো ও উপাদান তৈরিতে অসংখ্য প্রাচীন নক্ষত্র এবং গ্যালাক্সি একীভবনের ভূমিকা ছিল। ফলে আজ থেকে প্রায় ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি মহাজাগতিক সংঘর্ষকে বোঝা মানে শুধু একটি পুরোনো গ্যালাক্সির গল্প জানা নয়; বরং আমাদের মহাজাগতিক আবাস কীভাবে ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছে, সেই দীর্ঘ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উন্মোচন করা।

বিজ্ঞানীরা এখন আরও পুরোনো নক্ষত্রের বয়স নির্ধারণ এবং তাদের গতিপথ ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের দিকে নজর দিচ্ছেন। ভবিষ্যতের আরও উন্নত মহাকাশ পর্যবেক্ষণ, গাইয়া-ভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ কম্পন ব্যবহার করে বয়স নির্ধারণের মতো পদ্ধতি মিল্কিওয়ের প্রথম বিলিয়ন বছরের ইতিহাস আরও স্পষ্ট করতে পারে। ফলে আমাদের গ্যালাক্সির শৈশবের যে অংশ এতদিন মহাজাগতিক অন্ধকারে ঢাকা ছিল, সেটিও ধীরে ধীরে উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com