ছয় বছর পর সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরছেন হ্যারি-মেগান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
ছয় বছর পর সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরছেন হ্যারি-মেগান

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর প্রায় ছয় বছর পর আবার যুক্তরাজ্যে ফিরছেন প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কেল। এবার শুধু স্বল্প সময়ের সফর নয়, তাঁদের দুই সন্তান প্রিন্স আর্চি ও প্রিন্সেস লিলিবেটকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য যুক্তরাজ্যে থাকার পরিকল্পনা করছেন এই দম্পতি। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে তাঁদের সন্তানদের যুক্তরাজ্যেই স্কুলে পড়াশোনা শুরু করার কথা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে।

২০২০ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর হ্যারি ও মেগান যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। প্রথমে কানাডায় কিছু সময় কাটানোর পর তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এরপর থেকে তাঁদের জীবনের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হলেও ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক, পারিবারিক বিরোধ এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের আগ্রহ কখনো কমেনি।

হ্যারি-মেগানের যুক্তরাজ্যে ফেরার খবরটি তাই শুধু একটি পারিবারিক সফরের ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। দীর্ঘদিনের পারিবারিক দূরত্ব, রাজপরিবারের সঙ্গে টানাপোড়েন, নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ—সবকিছু মিলিয়ে তাঁদের এবারের প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হ্যারি ও মেগান তাঁদের সাত বছর বয়সী ছেলে প্রিন্স আর্চি এবং পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে প্রিন্সেস লিলিবেটকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরবেন। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যেই সন্তানদের স্কুলজীবন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাজ্যে তাঁদের অবস্থান আগের সফরগুলোর তুলনায় দীর্ঘ হতে পারে।

তবে তাঁরা রাজপরিবারের কোনো বাসভবনে থাকবেন না। ২০২০ সালে রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব ছাড়ার সময় তৎকালীন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে যে সমঝোতা হয়েছিল, তার ভিত্তিতে তাঁরা রাজপরিবারের দায়িত্ব পালন না করা সদস্য হিসেবেই থাকবেন। যুক্তরাজ্যে ফিরে এলেও তাঁদের জীবনযাপন রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকবে।

হ্যারি ও মেগানের সম্পর্কের গল্প শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। ঐতিহাসিক উইন্ডসর ক্যাসেলে তাঁদের বিয়ে হয়। সাবেক মার্কিন অভিনেত্রী মেগানের সঙ্গে হ্যারির বিয়েকে সে সময় ব্রিটিশ রাজপরিবারে পরিবর্তনের সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। মেগানের পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি রাজপরিবারকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলবে—এমন প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু বিয়ের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। দায়িত্ব পালনের ধরন, গণমাধ্যমের আচরণ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে মতপার্থক্যও ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসে। শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে হ্যারি ও মেগান রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

দায়িত্ব ছাড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তাঁরা ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারার কাছে মন্টেসিটো এলাকায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে তাঁদের পারিবারিক জীবন গড়ে ওঠে। একই সময়ে গণমাধ্যম ও বিনোদন জগতেও নিজেদের উপস্থিতি ধরে রাখার চেষ্টা করেন তাঁরা।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সময় হ্যারি ও মেগান রাজপরিবারকে ঘিরে তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। টেলিভিশন সাক্ষাৎকার, তথ্যচিত্র এবং হ্যারির আত্মজীবনীতে রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন বিরোধের বিষয় উঠে এসেছে। এসব প্রকাশনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করলেও ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁদের দূরত্ব আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

বিশেষ করে ২০২১ সালে মেগানের একটি বহুল আলোচিত টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে রাজপরিবারের এক সদস্যের বিরুদ্ধে তাঁদের সন্তানের সম্ভাব্য গায়ের রং নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভিযোগ করা হয়। বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। রাজপরিবারের পক্ষ থেকে অবশ্য বর্ণবাদের অভিযোগের সঙ্গে একমত হওয়া হয়নি।

হ্যারি তাঁর আত্মজীবনীতেও বাবা রাজা তৃতীয় চার্লস এবং বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়ামকে ঘিরে নানা ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করেন। এর ফলে দুই ভাইয়ের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে হ্যারি ও উইলিয়ামের সম্পর্ক খুব বেশি ঘনিষ্ঠ নয় বলেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

হ্যারির সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের সম্পর্কেও দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর যুক্তরাজ্যে তাঁর সরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়। হ্যারি এ নিয়ে আইনি লড়াইও করেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট না থাকলে সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফেরা তাঁর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাবা রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে হ্যারির সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দীর্ঘ বিরতির পর তাঁদের মধ্যে সাক্ষাৎ হয়েছে। চার্লসের অসুস্থতার সময়ও হ্যারি যুক্তরাজ্যে এসে বাবার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এতে বাবা-ছেলের সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও যোগাযোগের দরজা কিছুটা খোলা রয়েছে বলে মনে করা হয়।

রাজা তৃতীয় চার্লসের ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর হ্যারি তাঁর প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। পরে চার্লসের চিকিৎসায় উন্নতির কথাও জানা যায়। পরিবারের এই কঠিন সময়ে ব্যক্তিগত দূরত্বের মধ্যেও বাবা ও ছেলের সম্পর্কের কিছুটা মানবিক উষ্ণতা ফিরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

গত মাসেও হ্যারি, মেগান ও তাঁদের দুই সন্তান যুক্তরাজ্য সফর করেছিলেন। ওই সফরের সময় দীর্ঘ বিরতির পর রাজা চার্লস তাঁর নাতি-নাতনিদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। ২০২২ সালের পর নাতি-নাতনিদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হওয়ায় বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়। এবার সন্তানদের নিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য যুক্তরাজ্যে ফেরার পরিকল্পনা সেই পারিবারিক যোগাযোগকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।

তবে তাঁদের এবারের ফেরার পরিকল্পনা সম্পর্কে রাজপরিবারের প্রতিক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়। হ্যারি-মেগানের মুখপাত্র এবং বাকিংহাম প্যালেস এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র অবশ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো সঠিক বলে জানিয়েছে।

হ্যারি-মেগানের যুক্তরাজ্যে ফেরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা আর্চি ও লিলিবেট এবার যুক্তরাজ্যে স্কুলে পড়ার সুযোগ পেতে যাচ্ছে। এর ফলে তারা ব্রিটিশ রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছাকাছি থাকার সুযোগও পাবে। পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ তৈরি হলে প্রজন্মের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কিছুটা কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে সন্তানদের যুক্তরাজ্যে শিক্ষাজীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত কি না, তা এখনই বলা কঠিন। হ্যারি ও মেগানের প্রধান আবাসস্থল যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছে এবং তাঁদের পেশাগত ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশও সেখানেই পরিচালিত হয়। ফলে যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ সময় থাকা এবং স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করা—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় হ্যারি ও মেগান বিনোদন ও গণমাধ্যমভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন। নেটফ্লিক্সের সঙ্গে চুক্তি, পডকাস্ট এবং মেগানের জীবনযাপনভিত্তিক অনুষ্ঠান তাঁদের নতুন পেশাগত পরিচয় তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছে। তাঁদের আত্মজীবনীও ব্যাপক সাড়া পেয়েছে।

তবে সব প্রকল্প প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হয়নি। কিছু চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে, আবার কিছু অনুষ্ঠানও দীর্ঘ সময় ধরে চলেনি। হলিউডের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে তাঁরা যে ধরনের বড় তারকাখ্যাতি প্রত্যাশা করেছিলেন, তা পুরোপুরি অর্জন করতে পারেননি—এমন মন্তব্যও এসেছে বিনোদন অঙ্গন থেকে।

তারপরও হ্যারি ও মেগানকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ এখনো প্রবল। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিয়মিত আলোচনা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর যুক্তরাজ্যে তাঁদের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন সেই আগ্রহকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

এবারের প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে মানবিক দিকটি সম্ভবত পরিবারের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ক। রাজপরিবার থেকে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর আর্চি ও লিলিবেটের বেড়ে ওঠার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে। যুক্তরাজ্যে তাঁদের স্কুলজীবন শুরু হলে দাদা রাজা চার্লসসহ রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে হ্যারি ও উইলিয়ামের সম্পর্ক এখনো স্বাভাবিক হয়নি বলে ধারণা করা হয়। ফলে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক কতটা বদলাবে, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে হ্যারির দীর্ঘদিনের উদ্বেগ এবং রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে তাঁদের অবস্থানও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, ছয় বছর পর হ্যারি ও মেগানের যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ সময়ের জন্য ফেরার পরিকল্পনা রাজপরিবারের জন্যও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। এটি সরাসরি রাজপরিবারে ফিরে আসা নয়, আবার আগের মতো সম্পূর্ণ দূরত্ব বজায় রাখাও নয়। বরং সন্তানদের শিক্ষা, পারিবারিক যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত জীবনের প্রয়োজনের মধ্যে একটি নতুন ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা হিসেবে এই সিদ্ধান্তকে দেখা যেতে পারে। আগামী দিনে তাঁদের যুক্তরাজ্যে অবস্থান এবং রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত