দুর্নীতি তদন্তে জেলেনস্কির জ্যেষ্ঠ সহযোগী বরখাস্ত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার
দুর্নীতি তদন্তে জেলেনস্কির জ্যেষ্ঠ সহযোগী বরখাস্ত

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যেই নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে পড়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে তদন্তের মধ্যে তাঁর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ইরিনা মুডরাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি প্রেসিডেন্টের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত ও বাসায় তল্লাশির খবর প্রকাশের পরই এই বরখাস্তের সিদ্ধান্ত সামনে আসে। তবে ইরিনা মুডরাকে কেন সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো কারণ জানানো হয়নি।

ইউক্রেনের রাজনীতিতে ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ প্রকাশ্যে সরকারের শাসনব্যবস্থা ও দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মঙ্গলবার রাতে এক ভিডিও ভাষণে তিনি যুদ্ধের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর দাবি, ইউক্রেন শুধু দুর্নীতির সমস্যায় নয়, আরও গভীর একটি শাসনব্যবস্থাগত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে ইরিনা মুডরাকে বরখাস্তের ঘটনা এবং ফেদোরভের নির্বাচনের দাবি—দুই বিষয়ই এখন দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

ইরিনা মুডরা জেলেনস্কির প্রশাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় নীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করতেন। বিশেষ করে বিচারব্যবস্থা ও বিচার সংস্কারসংক্রান্ত বিষয়েও তাঁর দায়িত্ব ছিল। যুদ্ধের মতো জটিল পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার এভাবে পদ হারানো স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে গুরুত্ব পেয়েছে।

ইরিনার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা তাঁর বাসায় তল্লাশি চালিয়েছেন বলেও খবর এসেছে। এসব ঘটনার পর প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে ডিক্রি জারি করে তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে শুধু তল্লাশি বা তদন্তের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

ইরিনাকে বরখাস্তের সময়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের বক্তব্যের কারণে। জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ফেদোরভকে গত জুলাইয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর অপসারণের পর ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য বিক্ষোভের ঘটনাও সামনে আসে। পরে তিনি সরকারের কার্যক্রম এবং দেশের রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনামুখর হন।

ফেদোরভের মূল অভিযোগ, জেলেনস্কির নেতৃত্বাধীন সময়ে ইউক্রেনে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রেসিডেন্ট তা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট সফল হননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্নীতি আসলে বড় একটি সমস্যার লক্ষণ; এর পেছনে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় গভীর ও পদ্ধতিগত সংকট রয়েছে। তিনি এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ চললেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের পথ খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন।

যুদ্ধকালীন নির্বাচন আয়োজনের দাবি ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর দেশটিতে সামরিক আইন জারি রয়েছে। যুদ্ধের কারণে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রমের অনেক ক্ষেত্রেই বিধিনিষেধ রয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, অনেকে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং বিপুলসংখ্যক নাগরিক সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছেন। এমন অবস্থায় জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দিক থেকে বড় চ্যালেঞ্জ।

ফেদোরভ অবশ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে কার্যত জেলেনস্কির নেতৃত্বের প্রতি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাঁর এই অবস্থান কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়। তবে যুদ্ধের সময় সরকারের একজন সাবেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর এ ধরনের প্রকাশ্য বক্তব্য প্রেসিডেন্টের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

জেলেনস্কি অবশ্য ফেদোরভের অভিযোগ বা নির্বাচনের দাবির বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। বরং ফেদোরভের উত্তরসূরি হিসেবে উয়েভহেন খমারাকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দেওয়ায় ইউক্রেনের পার্লামেন্ট সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ পরিচালনা ও সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

এরই মধ্যে ইরিনা মুডরাকে বরখাস্তের ঘটনা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। যুদ্ধের সময় ইউক্রেন বিপুল পরিমাণ সামরিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা দেশটির আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।

দুর্নীতির অভিযোগে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত একদিকে সরকারের জন্য বিব্রতকর হলেও অন্যদিকে কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার প্রমাণ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। কোনো কর্মকর্তা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার অংশ। তবে তদন্ত যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইরিনার বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ইরিনাকে বরখাস্তের সঙ্গে ফেদোরভের রাজনৈতিক অবস্থানের সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য সামনে আসেনি। দুটি ঘটনা কাছাকাছি সময়ে ঘটায় রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বিষয় দুটি পাশাপাশি আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু সময়ের নৈকট্যকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইরিনার বিরুদ্ধে তদন্তের প্রকৃত বিষয়বস্তু এবং তাঁর বরখাস্তের সরকারি কারণ স্পষ্ট হলে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হতে পারে।

জেলেনস্কির জন্য বর্তমান পরিস্থিতি একাধিক দিক থেকে কঠিন। একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে পশ্চিমা মিত্রদের আস্থা ধরে রাখতে হচ্ছে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপরও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ বাড়ছে। ফলে সরকারের প্রতি জনআস্থা ধরে রাখা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এর আগে ইউক্রেনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। যদিও তাঁর ওই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছিল, যখন জেলেনস্কির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল। ফলে ওয়াশিংটনের অবস্থানও ইউক্রেনের নির্বাচন নিয়ে চলমান বিতর্ককে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে।

তবে ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজনের প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। যুদ্ধের বাস্তবতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ভোটারদের অবস্থান, বাস্তুচ্যুত মানুষের অংশগ্রহণ, বিদেশে থাকা নাগরিকদের ভোটাধিকার এবং সামরিক বাহিনীতে থাকা ভোটারদের অংশগ্রহণ—সবকিছু বিবেচনা করতে হবে। যুদ্ধের মাঝখানে নির্বাচন আয়োজন করলে ভোটের নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

ইরিনা মুডরার বরখাস্তের ঘটনায় তাই একদিকে দুর্নীতি তদন্ত, অন্যদিকে প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং একই সময়ে চলমান রাজনৈতিক চাপ—সবকিছুই একসঙ্গে সামনে এসেছে। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। একই সঙ্গে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নির্বাচন আয়োজনের দাবি ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরিনা মুডরার বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের ফলাফল। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি হবে। আবার অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি না থাকলে তাঁর আইনি অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে ফেদোরভের নির্বাচনের দাবি ইউক্রেনের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিও সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।

যুদ্ধের মধ্যে একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। জেলেনস্কির সামনে এখন এই দুই প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখার কঠিন দায়িত্ব। ইরিনা মুডরাকে বরখাস্তের ঘটনা সেই দায়িত্বের জটিলতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। যুদ্ধ চলতে থাকলেও ইউক্রেনের জনগণের কাছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর শাসনের প্রত্যাশা যে কমেনি, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত