কমছে মোবাইলের সর্বনিম্ন কলরেট, জানাল বিটিআরসি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার
কমছে মোবাইলের সর্বনিম্ন কলরেট, জানাল বিটিআরসি

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মোবাইল ফোনে কথা বলার খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনায় বর্তমানে নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভয়েস কলরেট বা ফ্লোর প্রাইস আরও কমানোর বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল কলের খরচ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা গ্রাহকদের জন্য এটি স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বুধবার ১৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত বিটিআরসির অনলাইন গণশুনানিতে জামালপুরের এক গ্রাহকের প্রশ্নের জবাবে কমিশনের সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বর্তমানে মোবাইল ফোনে কথা বলার সর্বনিম্ন সীমা প্রতি মিনিটে ৪৫ পয়সা এবং সর্বোচ্চ কলরেট দুই টাকা নির্ধারিত রয়েছে। গ্রাহকদের কথা বিবেচনায় নিয়ে সর্বনিম্ন সীমা আরও কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে কাজ চলমান রয়েছে।

মোবাইল ফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যবসায়িক কাজ, চাকরি, শিক্ষা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে প্রতিদিন কোটি কোটি মিনিট কথা বলেন গ্রাহকেরা। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ ও গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য ভয়েস কলের ব্যয় এখনো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ফলে সর্বনিম্ন কলরেট কমানো হলে এর প্রভাব সরাসরি গ্রাহকদের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর পড়তে পারে।

বর্তমানে মোবাইল অপারেটরদের বিভিন্ন প্যাকেজ, বান্ডেল ও অফারের কারণে গ্রাহকেরা বিভিন্ন দামে কথা বলার সুযোগ পেলেও কলরেটের সর্বনিম্ন সীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে থাকে। বিটিআরসি সেই সীমা কমানোর উদ্যোগ নিলে অপারেটরদের জন্য গ্রাহকদের আরও প্রতিযোগিতামূলক ভয়েস সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের পছন্দের ক্ষেত্রও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গণশুনানিতে শুধু কলরেট নয়, মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও গ্রাহকদের প্রত্যাশার বিষয় উঠে আসে। ট্যারিফ, ডাটার মেয়াদ, অব্যবহৃত ডাটা পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের সুযোগ বা ডাটা ক্যারি ফরওয়ার্ড, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, সিম নিবন্ধন, মোবাইল ফোন নিবন্ধন, ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর এবং সামগ্রিক সেবার মান নিয়ে গ্রাহকেরা প্রশ্ন ও অভিযোগ করেন।

এসব বিষয় থেকে স্পষ্ট হয়, মোবাইল গ্রাহকদের প্রত্যাশা এখন শুধু কম দামে কথা বলা বা ইন্টারনেট ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক, স্বচ্ছ тариф কাঠামো, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং ব্যবহারবান্ধব সেবা চান। একটি প্যাকেজের বিজ্ঞাপিত সুবিধা ও বাস্তবে পাওয়া সেবার মধ্যে পার্থক্য থাকলে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। তাই টেলিযোগাযোগ খাতে মূল্য ও সেবার মান—দুই দিকেই নিয়ন্ত্রক নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গণশুনানিতে বিটিআরসি জানিয়েছে, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১১ মাসে সেবার মানসহ বিভিন্ন বিষয়ে কমিশনের কাছে মোট ১৩ হাজার ৯টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে হেল্পলাইনের মাধ্যমে পাওয়া গেছে ৫ হাজার ৫১টি এবং ওয়েববক্সের মাধ্যমে এসেছে ৭ হাজার ৯৫৮টি অভিযোগ। এসব অভিযোগের মধ্যে ১১ হাজার ২৭৯টি, অর্থাৎ ৮৬ দশমিক ৭০ শতাংশ অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

তবে অভিযোগ নিষ্পত্তির এই হার নিয়ে সন্তুষ্ট নয় বিটিআরসি। গ্রাহকের অভিযোগ দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সমাধানের পাশাপাশি শতভাগ অভিযোগ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে কমিশন। এতে বোঝা যায়, টেলিযোগাযোগ সেবার ক্ষেত্রে শুধু নতুন নীতি গ্রহণ নয়, গ্রাহকের অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল সেবা ব্যবহারের সময় নেটওয়ার্ক সমস্যা, ভুল বিলিং, প্যাকেজ সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা সিম-সংক্রান্ত কোনো সমস্যায় পড়লে দ্রুত সমাধান না পেলে গ্রাহকের ভোগান্তি বাড়ে। বিশেষ করে যাঁদের কাজ ও আয় মোবাইল যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য এ ধরনের সমস্যা আর্থিক ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই অভিযোগ নিষ্পত্তির হার বাড়ানোর পাশাপাশি সমাধানের মান এবং সময়সীমা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

এবারের গণশুনানিতে অংশ নিতে ১৭ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত অনলাইনে ২ হাজার ৯৯০ জন গ্রাহক নিবন্ধন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন পেশাজীবী ছিলেন ১ হাজার ৪৭ জন। শিক্ষার্থী ছিলেন ৬৩৮ জন এবং নারী গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ১৭২ জন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ গণশুনানিতে গ্রাহকদের আগ্রহের বিষয়টিও তুলে ধরে।

ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা যত বিস্তৃত হচ্ছে, মোবাইল সেবার ওপর মানুষের নির্ভরতাও তত বাড়ছে। আগে যেখানে মোবাইল ফোন মূলত কথোপকথনের জন্য ব্যবহৃত হতো, এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরির যোগাযোগ, সরকারি সেবা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ফলে মোবাইল সেবার মূল্য ও মানের যেকোনো পরিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।

এ কারণে কলরেট কমানোর উদ্যোগকে শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতা, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং যোগাযোগের সুযোগের বিষয়ও জড়িত। বিশেষ করে যারা নিয়মিত মোবাইল ফোনে কথা বলেন এবং ভয়েস কলের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য প্রতি মিনিটের সামান্য মূল্য কমাও মাসিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

তবে সর্বনিম্ন কলরেট কমানোর উদ্যোগ বাস্তবে গ্রাহকের জন্য কতটা সুফল বয়ে আনবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও অপারেটরদের বাস্তব সেবামূল্যের ওপর। ফ্লোর প্রাইস কমানো মানেই সব কলের খরচ একই অনুপাতে কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই নতুন সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি গ্রাহকের জন্য ট্যারিফ কাঠামো আরও সহজ, স্বচ্ছ ও বোধগম্য করা জরুরি।

টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গ্রাহকের স্বার্থকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একদিকে অপারেটরদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে, অন্যদিকে গ্রাহক যেন ন্যায্য মূল্যে মানসম্মত সেবা পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে প্রতিযোগিতা কার্যকর হলে সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি মূল্য নিয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গণশুনানিতে বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে গ্রাহকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। কমিশনের প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক মো. মেহেদী উল সহিদ, স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল হক এবং লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগের মহাপরিচালক আশীষ কুমার কুন্ডুসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন।

গ্রাহকদের সরাসরি অভিযোগ ও প্রশ্ন শোনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন এসব অভিযোগ ও প্রত্যাশার কতটা কার্যকর সমাধান করা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কলরেট কমানোর উদ্যোগ, নেটওয়ার্ক কাভারেজ বাড়ানো, ডাটা ব্যবহারে স্বচ্ছতা এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন চান গ্রাহকেরা।

বিটিআরসির পক্ষ থেকে সর্বনিম্ন কলরেট কমানোর উদ্যোগের খবর তাই মোবাইল গ্রাহকদের জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত কোন পর্যায়ে যায় এবং নতুন সর্বনিম্ন কলরেট কত নির্ধারণ করা হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে গ্রাহকদের প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন। একই সঙ্গে সেবার মান উন্নত করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে টেলিযোগাযোগ খাতে গ্রাহক আস্থা আরও বাড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত