ভরা মৌসুমেও পায়রায় ইলিশ নেই, বিপাকে ৮ হাজার জেলে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
ভরা মৌসুমেও পায়রায় ইলিশ নেই, বিপাকে ৮ হাজার জেলে

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বরগুনার তালতলীর পায়রা নদীতে ইলিশের ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত মাছ ধরা পড়ছে না। নদীর ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা, অথচ মাছ ধরার ব্যস্ততার বদলে অনেক জেলেকেই অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। দিনের পর দিন নদীতে জাল ফেলেও আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় আয়-রোজগার কমে গেছে। সংসারের খরচ, নৌকার জ্বালানি, জালের ব্যয় এবং ধারদেনা মেটাতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন উপকূলের জেলে পরিবারগুলো।

স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, পায়রা নদীর সাগরমোহনায় বিস্তৃত ডুবোচর নদীতে জোয়ারের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি তালতলীর জয়ালভাঙ্গা এলাকায় স্থাপিত আইসোটেক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত উষ্ণ পানি ও বর্জ্য নদীর পরিবেশে প্রভাব ফেলছে বলেও তাঁদের অভিযোগ। এসব কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও নদীতে প্রবেশ ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।

তালতলীতে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার ৯০০। তাঁদের বড় একটি অংশের জীবিকা সরাসরি নদী ও সাগরের মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। বছরের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস ইলিশের মৌসুম হওয়ায় এ সময়টিকে ঘিরেই তাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা থাকে। ভরা মৌসুমে ভালো মাছ পাওয়া গেলে জেলেরা বছরের অন্যান্য সময়ের খরচ সামলানোর সুযোগ পান। কিন্তু এবার সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পায়রা-বিষখালী নদীর মোহনায় বড়াইয়্যার ডুবোচর দীর্ঘ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এর পাশাপাশি নলবুনিয়ার ডুবোচর, পদ্মা ও কুমিরমারা চরও নদীর প্রবেশমুখে তৈরি হয়েছে। ভাটার সময় এসব চর অনেক জায়গায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও মানুষ হেঁটেও পার হতে পারেন। আবার জোয়ারের সময় চরগুলোর আশপাশে প্রবল স্রোত ও ঢেউ তৈরি হয়। জেলেদের অভিযোগ, এই পরিবর্তিত নাব্যতা ও স্রোতের কারণে সাগর থেকে ইলিশ নদীতে ঢোকার স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

নলবুনিয়ার জেলে হিরন হাওলাদার বলেন, মোহনায় চর তৈরি হওয়ায় সাগরের জোয়ারের পানি আগের মতো পায়রা নদীতে ঢুকতে পারে না। ফলে ইলিশও নদীতে ঢুকতে পারছে না বলে তাঁদের ধারণা। তাঁর মতে, মোহনার ডুবোচর অপসারণ করা না হলে নদীতে ইলিশের পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা কম।

তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের জেলে মহসিনও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, জোয়ারের শুরুতে নদীতে পর্যাপ্ত স্রোত থাকে না। মাঝজোয়ারে স্রোত কিছুটা বাড়লে অল্পসংখ্যক ইলিশ ধরা পড়ে। তবে সেই পরিমাণ দিয়ে জেলেদের নৌকা চালানো, জাল মেরামত ও পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

পায়রা নদীর মোহনায় নাব্যতা সংকটের বিষয়টি স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্যেও উঠে এসেছে। তালতলী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন জানিয়েছেন, সাগর মোহনায় ডুবোচর সৃষ্টির কারণে পায়রা নদীর নাব্যতা কমেছে। এর ফলে জোয়ারের স্রোতের তীব্রতা কমে যাওয়ায় ইলিশের নদীতে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে মোহনায় প্রয়োজনীয় খনন করা হলে ইলিশের চলাচলের পরিবেশ উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে শুধু ডুবোচর নয়, নদীর পরিবেশ নিয়ে আরেকটি অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন স্থানীয়রা। তালতলীর জয়ালভাঙ্গা এলাকায় ২০১৯ সালে আইসোটেক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয় এবং ২০২২ সালে কেন্দ্রটি উৎপাদনে যায়। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, কেন্দ্রের কার্যক্রম থেকে নির্গত উষ্ণ পানি ও বর্জ্য পায়রা নদীর পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাঁদের দাবি, নদীর পানির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ও জলজ জীববৈচিত্র্যে পরিবর্তন ঘটলে ইলিশের বিচরণও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে এর আগেও স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ ও জীবিকার সংকটের অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরও তালতলীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে নদী দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীবিকা সংকটের অভিযোগ তুলে স্থানীয়রা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন।

মৎস্য ও জলজ পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও পায়রা নদীর নাব্যতা ও পরিবেশগত পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলীর মতে, ইলিশের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত গভীর পানি প্রয়োজন। নদীর মোহনায় ডুবোচর ও নাব্যতা সংকট সেই পরিবেশকে ব্যাহত করতে পারে। একই সঙ্গে নদীর পানির উষ্ণতা ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটলে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণেও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পায়রা নদীতে ইলিশ একেবারেই নেই—এমন নয়। সাম্প্রতিক সময়েও এ নদীতে দুই থেকে প্রায় তিন কেজি ওজনের ইলিশ ধরা পড়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে স্থানীয় জেলেদের অভিজ্ঞতা হলো, এমন বড় মাছ নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না এবং সামগ্রিকভাবে আহরণের পরিমাণ তাঁদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ছে জেলেদের পরিবারে। মাছ না পাওয়ার অর্থ শুধু একটি দিনের আয় কমে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নৌকার জ্বালানি, বরফ, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জামের খরচ। নদীতে গিয়ে যদি পর্যাপ্ত মাছ না মেলে, তাহলে দিনের খরচও অনেক সময় ওঠে না। ফলে ধারদেনা বাড়ে, সংসারের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমাতে হয় এবং অনেক পরিবারকে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে হয়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও তালতলী ও আশপাশের এলাকায় মাছের সংকটের কারণে জেলে ও কৃষক পরিবারের জীবিকা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।

জেলেদের কাছে ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়; এটি তাঁদের পারিবারিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা। বর্ষার মৌসুমে নদীতে ইলিশের জোগান বাড়লে তাঁরা একদিকে যেমন আয় করেন, অন্যদিকে আগের ঋণ পরিশোধ ও ভবিষ্যৎ দিনের জন্য কিছু অর্থ জমাতে পারেন। কিন্তু সেই মৌসুমেই যদি নদীর জালে মাছ না ওঠে, তাহলে বছরের বাকি সময়টাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

এ অবস্থায় স্থানীয় জেলেদের প্রধান দাবি, পায়রা নদীর মোহনায় ডুবোচরের কারণে নাব্যতা কতটা কমেছে তা বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় খনন করা এবং নদীতে বর্জ্য ও উষ্ণ পানির প্রভাব যথাযথভাবে যাচাই করা। তাঁরা মনে করেন, শুধু মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা বা জেলেদের ওপর নিয়মকানুন আরোপ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননের জন্য নদীর পরিবেশও সুরক্ষিত রাখতে হবে।

পায়রা নদীর এই পরিস্থিতি তাই শুধু ইলিশের সংকট নয়, উপকূলীয় একটি বড় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। নদীর নাব্যতা, পানির গুণগত মান, জলজ জীববৈচিত্র্য এবং মাছের প্রজনন পরিবেশ—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ নদীতে মাছ না থাকলে ঘাটে বাঁধা নৌকাগুলো যেমন নীরব হয়ে যায়, তেমনি সেই নৌকার ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবারের ঘরেও নেমে আসে অনিশ্চয়তা।

তালতলীর জেলেদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পায়রা নদীর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে ইলিশের বিচরণ বাড়তে পারে, আর তাতে নতুন করে প্রাণ ফিরতে পারে নদীকেন্দ্রিক এই জনপদের অর্থনীতিতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত