প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বুধবার দেশটির জাতীয় ঋণের পরিমাণ এই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। ঋণের এই দ্রুত বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোকে শুধু একটি বড় সংখ্যার রেকর্ড হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি, সরকারি ব্যয়ের বৃদ্ধি, আগের নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপ এবং প্রতিরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো বড় খাতে সরকারের ব্যয়। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সরকারি ঋণের ভারসাম্য বজায় রাখাও এখন ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ কত দ্রুত বাড়ছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় সাম্প্রতিক সময়ের হিসাব থেকে। চলতি বছরের মার্চে দেশটির জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তার মাত্র পাঁচ মাস আগে গত বছরের অক্টোবরে ঋণ ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে। অর্থাৎ প্রায় ১০ মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ বেড়েছে ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য ঋণের এই গতি বিশেষভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে ব্যবধান রয়েছে, জাতীয় ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ সেটিই। সরকার যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, অনেক সময় কর ও অন্যান্য উৎস থেকে সেই পরিমাণ আয় হয় না। ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে ঋণ নিতে হয়। এক বছরের ঘাটতি পরবর্তী সময়ে জাতীয় ঋণের বোঝায় যুক্ত হয়। এভাবে ধারাবাহিক বাজেট ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ চলে যায় প্রতিরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, মেডিকেয়ার এবং আগের ঋণের সুদ পরিশোধে। এসব খাতের অনেক ব্যয় কমানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন। আবার জনসংখ্যার পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি খাতে সরকারের ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ছে।
বর্তমান প্রশাসনও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সময়ে গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে চলমান দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে একদিকে নতুন ব্যয়ের প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে আগের ঋণের সুদ পরিশোধেও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে অবশ্য সরকারি ব্যয়ে অপচয়, প্রতারণা ও অনিয়ম কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মাধ্যমে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যও তুলে ধরা হয়েছে। অর্থনীতির আকার দ্রুত বাড়লে একই পরিমাণ ঋণ তুলনামূলকভাবে কম চাপ তৈরি করতে পারে। তবে ঋণের বর্তমান গতি সেই ভারসাম্য ধরে রাখাকে কঠিন করে তুলছে।
জাতীয় ঋণের প্রভাব শুধু সরকারের হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ঋণের খরচ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়ও জড়িত। সরকারকে যখন আগের ঋণের বিপরীতে বেশি সুদ পরিশোধ করতে হয়, তখন বাজেটের একটি বড় অংশ ঋণ পরিশোধেই চলে যেতে পারে। এতে শিক্ষা, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, গবেষণা কিংবা অন্যান্য উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সরকারের ঋণের চাপ আর্থিক বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিপুল পরিমাণ সরকারি ঋণ অর্থায়নের জন্য সরকারের বন্ড বিক্রির প্রয়োজন বাড়তে পারে। এতে ঋণের বাজারে সুদের হারের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুদের হার বাড়লে বাড়ি বা গাড়ি কেনার জন্য সাধারণ মানুষকে বেশি ব্যয় করতে হতে পারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগ করা ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
ব্যবসায়িক বিনিয়োগের খরচ বাড়লে নতুন কারখানা, প্রযুক্তি বা কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে সরকারের বাড়তি ব্যয় যদি অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি করে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে জাতীয় ঋণ ব্যবস্থাপনা শুধু সরকারি অর্থের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের আয়, ব্যয় ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সুযোগও যুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় ঋণের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির সরকার নির্দিষ্ট একটি আইনগত সীমার মধ্যে ঋণ নিতে পারে, যাকে ‘ডেট সিলিং’ বা ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বলা হয়। এই সীমা নির্ধারণ, বাড়ানো অথবা সাময়িকভাবে স্থগিত করার ক্ষমতা রয়েছে কংগ্রেসের হাতে। ফলে জাতীয় ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেট সিলিং নিয়েও রাজনৈতিক আলোচনা ও দর-কষাকষির প্রয়োজন তৈরি হয়।
আগামী বছরও এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা সামনে আসতে পারে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শীতের শেষ থেকে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সে সময় কংগ্রেসকে আবারও ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বাড়ানো অথবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা স্থগিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর আর্থিক বোঝা বাড়ার আশঙ্কার কথাও বলছেন ভারসাম্যপূর্ণ বাজেটের সমর্থকেরা। তাঁদের যুক্তি হলো, সরকার যদি দীর্ঘ সময় ধরে আয়ের তুলনায় বেশি ব্যয় করতে থাকে, তাহলে একপর্যায়ে ঋণের সুদ পরিশোধই বাজেটের বড় অংশ দখল করতে পারে। তখন ব্যয় কমানো, কর বাড়ানো অথবা আরও ঋণ নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে।
দ্বিদলীয় নীতি কেন্দ্রের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী মার্গারেট স্পেলিংসের মতে, ফেডারেল ঋণ ইতোমধ্যেই মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারের অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। তাঁর মতে, বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তন, মন্দা, বৈশ্বিক যুদ্ধ কিংবা অন্য কোনো বড় সংকট তৈরি হলে ঋণের চাপ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক পরিস্থিতি গুরুত্ব পাচ্ছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। জাতীয় ঋণ দ্রুত বাড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি ব্যয় ও ঋণের সুদের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হচ্ছে।
তবে বিপুল জাতীয় ঋণ থাকা মানেই তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে—এমনটি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং দেশটির নিজস্ব মুদ্রা মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই অবস্থান সরকারকে তুলনামূলকভাবে বড় পরিসরে ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা দেয়। কিন্তু ঋণ যত বাড়তে থাকে, সুদ পরিশোধের ব্যয়ও তত বাড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি হয়ে পড়ে।
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক তাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের প্রতীক। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নয়ন ব্যয়ের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ঋণের সুদ এবং বাজেট ঘাটতিও সামলাতে হচ্ছে।
আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি কতটা ঋণনির্ভর থাকবে, সরকারি ব্যয় কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কতটা দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে—এসব প্রশ্নের ওপর দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতার বড় অংশ নির্ভর করছে। ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের এই রেকর্ড তাই শুধু একটি সংখ্যাগত মাইলফলক নয়; এটি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির সামনে থাকা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ভারসাম্যের কঠিন বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।