প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার চক্রধা ইউনিয়নের বিলশরন গ্রামে ফসলি জমিতে বালু ফেলে প্রায় ৬০ বিঘা জমি দখলের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ড্রেজার দিয়ে রাতের আঁধারে তাঁদের জমিতে বালু ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। এতে ১৮ থেকে ২০ জন কৃষক তাঁদের দীর্ঘদিনের চাষাবাদের জমি হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
কৃষকদের দাবি, বিলশরন গ্রামের বাসিন্দা ও মালয়েশিয়া প্রবাসী বাবুল মিয়া তাঁদের কোনো ধরনের অনুমতি বা সম্মতি না নিয়ে কারখানার পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে থাকা ফসলি জমিতে বালু ভরাট করছেন। জমিতে বালু ফেলার পাশাপাশি সীমানা ঘিরে দেয়াল নির্মাণের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। ফলে জমিগুলো শেষ পর্যন্ত দখলে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, এসব জমিতে বছরের পর বছর ধরে তাঁরা বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। অনেকের কাছে জমিগুলো শুধু সম্পত্তি নয়, পরিবারের আয় ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অন্যতম অবলম্বন। হঠাৎ করে জমিতে বালু ফেলে ভরাট করায় তাঁদের চাষাবাদ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি জমির মালিকানা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বাবুল মিয়া কয়েক বছর আগে বিলশরন রাস্তার পাশে মোস্তফা নামে এক ব্যক্তির জমি দখল করে সেখানে ‘ওরি ফুডস অ্যান্ড প্যাকেজিং’ নামে একটি কারখানা নির্মাণ করেন। ওই জমি নিয়ে এখনও মামলা চলমান রয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা। এবার কারখানার আশপাশের আরও ফসলি জমিতে বালু ফেলে ভরাটের কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জমির মালিকরা জানান, তাঁদের জমি নিচু হওয়ায় সেখানে বছরে একটি ফসল হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জমিগুলো বিক্রি করে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। কৃষকদের ভাষ্য, জমিতে বালু ফেলার বিষয়ে তাঁরা জানতে চাইলে বাবুল মিয়া তাঁদের জমি বিক্রি করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। বিনিময়ে সন্তোষজনক অর্থ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, তাঁরা জমি বিক্রি করতে রাজি নন। তাঁদের কাছে এসব জমি চাষাবাদ ও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। জমি বিক্রি না করলেও সেখানে বালু ফেলে ভরাট করে দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
স্থানীয় কৃষকদের আরও অভিযোগ, তাঁদের বাধার পরও প্রভাব খাটিয়ে জমিতে বালু ফেলা হয়েছে। নদী থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু এনে রাতের আঁধারে জমিতে ফেলার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। জমির মালিকদের ভাষ্য, বালু ফেলার আগে তাঁদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি এবং তাঁদের অনুমতিও নেওয়া হয়নি।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে কৃষকরা উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। গত ১০ আগস্ট তাঁরা শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইয়াসমিনের কাছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান। অভিযোগে জমিতে বালু ফেলা বন্ধ করা এবং কৃষকদের জমি রক্ষায় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
এরপর গত ১৭ আগস্ট ১৮ থেকে ২০ জন কৃষক উপজেলা পরিষদ মাঠে স্থানীয় সংসদ সদস্য মনজুর এলাহীর কাছে বিষয়টি মৌখিকভাবে তুলে ধরেন। কৃষকদের অভিযোগ শুনে তিনি বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
জমির মালিকদের মধ্যে আশরাফপুর গ্রামের কৃষক সায়েম খান, মনজুর হোসেন ও আবদুল বাতেন এবং বিলশরন গ্রামের মোতালিব, ডা. নুরু খন্দকার ও মোস্তফাসহ আরও কয়েকজন রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, জমিতে বালু ফেলার কারণে ফসলি জমির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বালু ভরাট হয়ে গেলে জমিতে চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না। পাশাপাশি চারপাশে দেয়াল নির্মাণ করা হলে জমিতে প্রবেশ ও চাষাবাদের পথও বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
কৃষকদের অভিযোগের পর উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইয়াসমিন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগ পাওয়ার পর কারখানার মালিককে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছিল। তবে তিনি নিজে উপস্থিত না হয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানের একজন ম্যানেজারকে পাঠান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, কৃষকদের জমিতে বালু ফেলা থেকে বিরত থাকতে কারখানা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে যে পরিমাণ বালু ফেলা হয়েছে, সেগুলো সরিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষকদের জমি নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তা খতিয়ে দেখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে কারখানার মালিক বাবুল মিয়ার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনকল গ্রহণ করেননি। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার জয়নাল আবেদীন জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গত ১৭ আগস্ট প্রতিষ্ঠানের মালিককে ডেকেছিলেন। তিনি দেশে না থাকায় তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। ইউএনও কৃষকের জমিতে বালু ফেলতে নিষেধ করেছেন এবং ইতোমধ্যে ফেলা বালু সরিয়ে নিতে বলেছেন। প্রশাসনের এই বক্তব্য কারখানার মালিককে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মনজুর এলাহী বলেন, কৃষকরা বিষয়টি তাঁকে জানিয়েছেন। জমির মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনো জমিতে বালু ফেলা বা দখল করা উচিত নয়। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে জমিতে বালু ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে। তাঁদের আশঙ্কা, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দ্রুত বালু অপসারণ করা না হলে ভরাট করা জমিতে স্থায়ী স্থাপনা বা সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
কৃষকদের দাবি, তাঁদের জমি নিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকৃত মালিকানা, জমির ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফসলি জমি রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি চান তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা, অভিযোগটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হবে এবং জমির মালিকদের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফসলি জমি একটি এলাকার কৃষি ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কোনো জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা শুধু মালিকানা প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষকের আয়, পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা এবং স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি। বিলশরন গ্রামের ১৮ থেকে ২০ জন কৃষকের অভিযোগও তাই স্থানীয়ভাবে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের নির্দেশের পর বালু অপসারণ করা হয় কি না এবং ভবিষ্যতে ওই জমিতে কোনো স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের।