জ্বালানি সংকটে রপ্তানি খাত,৬৩ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য কঠিন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার
জ্বালানি সংকটে রপ্তানি খাত,৬৩ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য কঠিন

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নতুন অর্থবছরে বড় ধরনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈশ্বিক চাহিদার অনিশ্চয়তা এবং শিল্প খাতের নানা সীমাবদ্ধতা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পণ্য ও সেবা মিলিয়ে ৬৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় এ লক্ষ্য বেশ উচ্চাভিলাষী।

নতুন অর্থবছরের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং সেবা খাত থেকে ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের নির্ধারিত এই লক্ষ্যমাত্রায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে তৈরি পোশাক খাত। এই খাত থেকে ৪৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। গত অর্থবছরে তৈরি পোশাক থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।

তবে লক্ষ্য যতটা বড়, বাস্তবতার চিত্র ততটা স্বস্তিদায়ক নয়। গত অর্থবছরের রপ্তানি পারফরম্যান্সেই এর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫৫ বিলিয়ন ডলার এবং সেবা খাত থেকে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সব মিলিয়ে লক্ষ্য ছিল ৬৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বছর শেষে সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। মোট পণ্য রপ্তানি আয় প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যা আগের অর্থবছরের ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ০ দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।

নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি রপ্তানি খাতকে আরও গতিশীল করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। কিন্তু জ্বালানি সংকট সেই প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকায় অনেক শিল্পকারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও যন্ত্রপাতি চালু রাখতে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা রপ্তানিকারকদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ২৪ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের একই সময়ে আয় হয়েছে প্রায় ২৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ছয় মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। রপ্তানির এই সামান্য প্রবৃদ্ধি সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যের তুলনায় বড় ব্যবধানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ছয় মাসের পরিসংখ্যানে মাসভিত্তিক ওঠানামাও ছিল স্পষ্ট। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি আয় হয় ৩ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই মাসে আয় হয়েছিল ৩ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার দুর্বলতা এ পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে।

মার্চে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ওই মাসে রপ্তানি আয় নেমে আসে প্রায় ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের মার্চে আয় ছিল প্রায় ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমে প্রায় ১৮ শতাংশ। রমজান, দীর্ঘ ঈদের ছুটি, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা এ সময় রপ্তানি খাতে চাপ তৈরি করে।

এপ্রিল মাসে অবশ্য পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ওই মাসে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় প্রায় ৪ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল প্রায় ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার। ফলে প্রবৃদ্ধি হয় ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ। মার্চে ছুটি ও উৎপাদন বিঘ্নের কারণে আটকে থাকা কিছু চালান পরবর্তী সময়ে পাঠানো এবং তৈরি পোশাকের শিপমেন্ট বৃদ্ধির ফলে এপ্রিলের এই উল্লম্ফন ঘটে।

তবে এপ্রিলের প্রবৃদ্ধি পরবর্তী মাসে ধরে রাখা যায়নি। মে মাসে রপ্তানি আয় হয় ৪ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ কম। ঈদের দীর্ঘ ছুটি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার মন্থরতা এ সময় রপ্তানিতে প্রভাব ফেলে।

জুনে আবারও বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। মাসটিতে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের একই মাসে আয় হয়েছিল ৩ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর ভালো পারফরম্যান্স জুনের আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি আয় আরও বেড়ে ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। জুনের তুলনায় এটি ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। তবে আগের বছরের জুলাইয়ের ৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় আয় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ কম। একই সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতেও ১ দশমিক ৯২ শতাংশ পতন হয়েছে।

রপ্তানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতাও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিকল্পনাকে ব্যাহত করছে। উৎপাদন কমে গেলে সময়মতো ক্রয়াদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার উৎপাদন ব্যয় বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে যায়।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, কোনো সরকারকে মাত্র ছয় মাসের কর্মকাণ্ড দিয়ে মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়। তবে ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা এবং বেসরকারি খাতকে সহায়তার ক্ষেত্রে নতুন সরকারের কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক। বিশেষ করে বন্ড সুবিধাবিহীন আংশিক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ রপ্তানিকারকদের জন্য সহায়ক হতে পারে।

তার মতে, করনীতিতে কিছু পরিবর্তন এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়া হলেও শিল্পের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের সমস্যাগুলো পুরোপুরি সমাধান না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতিও বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে দেশের রপ্তানি খাত একদিকে নতুন সম্ভাবনার দরজা খোলার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সেই সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। ৬৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে শুধু রপ্তানি আদেশ বাড়ানোই যথেষ্ট হবে না; নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে এসব সংকট দ্রুত মোকাবিলা করা না গেলে উচ্চাভিলাষী রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত