প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ, খাল-বিল আর ছায়াঘেরা প্রকৃতির সঙ্গে শৈশবেই পরিচয় হয়েছিল জোয়ারদার নওশের আলীর। ১৯৩৮ সালে ঝিনাইদহে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মা-বাবাকে হারান। এরপর স্বজনদের দ্বন্দ্ব ও আইনি জটিলতায় হারাতে হয় পৈতৃক সম্পত্তিও। নিজের জমিতেই অন্যের গরু চরিয়ে বেড়ে ওঠা সেই শিশুই পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হন। তবে শৈশবের সেই মাঠ, কৃষি ও প্রকৃতির টান কখনো তাঁকে ছাড়েনি।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই টান থেকেই গড়ে তুলেছেন গাজীপুরের শ্রীপুরে ৬৫ বিঘার বেশি জমির ‘তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামার’। ৮৮ বছর বয়স পেরিয়েও সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন খামারে গিয়ে কৃষিকাজের তদারকি করেন তিনি। তাঁর কাছে এটি শুধু একটি কৃষি উদ্যোগ নয়; নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পরিবেশবান্ধব খাদ্য উৎপাদনের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রয়াস।
মা-বাবাকে হারানোর পর দাদি আফিরন নেছার কাছে আশ্রয় নেন নওশের আলী। সেখানে অন্যের গরু চরানোর পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যান। দাদির মুখে শোনা একটি ছড়া তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে—‘দুধে পুষ্টি বৃদ্ধি; ঘিয়ে বৃদ্ধি বল; মাংসে মাংস বৃদ্ধি; শাকে বৃদ্ধি মল।’
গবাদিপশু, সবজি, খাদ্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের সম্পর্কের এই প্রাথমিক ধারণাই পরবর্তী সময়ে তাঁর কৃষিচিন্তার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯৫৬ সালে স্থানীয় বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন নওশের আলী। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে অনার্স সম্পন্ন করে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ চাকরিজীবনের পর ১৯৮৯ সালে যুগ্ম সচিবের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ব্যবসায় যুক্ত হন এবং নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
তবে পেশাগত সাফল্যের মধ্যেও শৈশবের হারানো মাঠের স্মৃতি তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। নিজের জমিতে অন্যের গরু চরানোর সেই দিনগুলোর স্মৃতি থেকেই কৃষির সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
১৯৮৪ সালের দিকে গাজীপুরের শ্রীপুরের বাহাদুরপুর গ্রামে জমি কিনে কৃষির সঙ্গে নতুন করে পথচলা শুরু করেন নওশের আলী। পরে সেখানে জমি সম্প্রসারণের সুযোগ না থাকায় ২০১০ সালে শ্রীপুরের শৈলাট গ্রামে তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামারের কার্যক্রম শুরু করেন।
২০১৬ সাল থেকে খামারে প্রকৃতিনির্ভর পদ্ধতিতে বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে। নিজেদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্যের বাজারেও অবদান রাখছে খামারটি। ২০২৫ সাল থেকে শ্রীপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে উত্তম কৃষি চর্চা বা গ্যাপ অনুসরণ করে ফল ও ফসল উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের কার্যক্রম চলছে।
খামারে রয়েছে নানা জাতের শত শত ফলের গাছ। এর মধ্যে প্রায় ৩৫০টি আমগাছ, ২২০টি কাঁঠাল, ১৩০টি লিচু, ৮০টি পেয়ারা, ২৫০টি পেঁপে, ৩০০টি লেবু, ২৫০টি মালটা ও কমলা, ১২০টি বরই, ৫৬টি রামবুটান এবং ৯৫টি অ্যাভোকাডো গাছ রয়েছে। এ ছাড়া আমলকী, সফেদা, কতবেল, শরিফা, আতা, পার্সিমন, কামরাঙা, ব্রেডফ্রুট ও জগডুমুরসহ বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ রয়েছে। খামারে প্রায় দুই হাজার সুপারি গাছও রয়েছে।
তিলোত্তমায় মৌসুমভেদে বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করা হয়। খরিপ মৌসুমে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, বরবটি, ধুন্দল, কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, পটোল, বিভিন্ন জাতের গাছ আলু, কচু, কাঁচা পেঁপে, শজিনা, ডাঁটা, ঢ্যাঁড়শ, লালশাক ও পুঁইশাক চাষ করা হয়।
রবি মৌসুমে উৎপাদিত হয় আলু, শিম, গাজর, মুলা, শালগম, লেটুস, ধনিয়াপাতা, পালংশাক ও লালশাকসহ নানা শীতকালীন সবজি। পাশাপাশি পাটনাই, লাকাডাং, বারি হলুদ, বিভিন্ন জাতের আদা, কালো আদা, পেঁয়াজ, রসুন ও মরিচও চাষ করা হয়।
খামারে প্রায় ১৫ বিঘা আয়তনের পাঁচটি পুকুর রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষের পাশাপাশি আমন ও বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদন করা হয়। জৈব সার তৈরির জন্য গবাদিপশুও পালন করা হয়। প্রায় এক হাজার মুরগি উন্মুক্ত পরিবেশে পালন করা হচ্ছে।
খামারে ১২ জন স্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারী রয়েছেন। মৌসুম অনুযায়ী অতিরিক্ত শ্রমিকও নিয়োগ করা হয়। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নয়নেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষিকাজে নওশের আলীকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করছেন টাঙ্গাইলের মধুপুরের কৃষি উদ্যোক্তা ছানোয়ার হোসেন। তাঁর মতে, নিরাপদ কৃষি জটিল কোনো বিষয় নয়। ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে ও সঠিক মাত্রায় প্রয়োজনীয় উপাদান দিতে পারলেই নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সম্ভব।
খামারের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত মো. মিজানুর রহমান জানান, অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষের জন্য খামারে বড় একটি কম্পোস্ট হাউস তৈরি করা হয়েছে। সরিষার খৈল, ছাই, গরুর মলমূত্র ও তিতা পাতার নির্যাস ব্যবহার করে জৈব সার তৈরি করা হয়।
তাঁর ভাষায়, খামারটিকে এমনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদ একই বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে থাকতে পারে। অর্থাৎ প্রচলিত একমাত্রিক কৃষির পরিবর্তে একটি সমন্বিত কৃষি-বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলাই তিলোত্তমার অন্যতম লক্ষ্য।
খামারে উৎপাদিত পণ্য এখন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন নিরাপদ খাদ্যের আউটলেটে বিক্রি হচ্ছে। হর্টেক্স ফাউন্ডেশন পরিচালিত কৃষকের বাজার, মোহাম্মদপুরের প্রাকৃতিক কৃষি, অঙ্কুর ও হাউস অব হারমোনিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এসব পণ্য পাওয়া যায়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর লালমাটিয়ায় ‘সুপণ্য’ নামে তিলোত্তমার প্রথম নিজস্ব আউটলেট চালু হয়েছে। অ্যাগ্রোইকোলজিক্যাল পদ্ধতিতে উৎপাদিত নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পরিবেশবান্ধব খাদ্য মানুষের কাছে সহজলভ্য করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
ভবিষ্যতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও আউটলেট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকৃতিনির্ভর কৃষিতে উৎপাদিত নিরাপদ খাদ্য আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চায় তিলোত্তমা।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ তিলোত্তমা অর্গানিক ফার্ম পরিদর্শন করে অ্যাগ্রোইকোলজিক্যাল পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
তাঁর মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে এ ধরনের পদ্ধতির বিকল্প নেই। অ্যাগ্রোইকোলজিক্যাল ফার্মিং একটি বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষিপদ্ধতি, যেখানে মাটির জীব, জড় ও ভৌত উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ফসল উৎপাদন করা হয়।
এতে মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রাকৃতিক সম্পর্ক এবং খাদ্যশৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব। ফলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তি তৈরি হয়।
ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদের মতে, এ ধরনের পদ্ধতিতে উৎপাদিত খাদ্যে পুষ্টি উপাদান ধরে রাখার সুযোগ বেশি। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ ও বর্জ্য কমানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিলোত্তমার কর্ণধার জোয়ারদার নওশের আলীর কাছে নিরাপদ খাদ্য এখন আর বিলাসিতার বিষয় নয়। বরং মানুষের সুস্থ জীবনের জন্য এটি প্রয়োজনীয়তা।
তিনি মনে করেন, জীবনের এই পর্যায়ে মানুষের জন্য বড় কিছু করার সুযোগ সীমিত হলেও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের উপকারে কিছুটা অবদান রাখা সম্ভব। সেই বিশ্বাস থেকেই তিলোত্তমার পথচলা।
তাঁর স্বপ্ন, তিলোত্তমা একদিন শুধু একটি কৃষি খামার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নিরাপদ খাদ্য, প্রকৃতিনির্ভর কৃষি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকে ঘিরে এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের রূপ নেবে।
রাসায়নিক সার ও কীটনাশকনির্ভর কৃষির পরিবর্তে প্রকৃতিনির্ভর ও বিজ্ঞানভিত্তিক অ্যাগ্রোইকোলজিক্যাল কৃষিকে ভবিষ্যতের পথ হিসেবে দেখছেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য একটাই—নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পরিবেশবান্ধব খাদ্যকে আরও বেশি মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া।