চীন-রাশিয়ায় ভর করে ইরানকে চাপের পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
চীন-রাশিয়ায় ভর করে ইরানকে চাপের পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে

প্রকাশ: ২১ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ঘোষিত পরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলা নয়, বরং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক সম্পর্ক রাখা অন্য দেশগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার মাধ্যমে তেহরানকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে চীন ও রাশিয়া। ইরানের সঙ্গে এই দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ওয়াশিংটনের চাপ প্রয়োগের সুযোগকে অনেকটাই সীমিত করে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপের উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের তেল বিক্রি, অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা বিনিময়, জাহাজ নিবন্ধন এবং বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত কথিত নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান ইরানকে এসব কর্মকাণ্ডে সহায়তা করবে, তাদেরও গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

ওয়াশিংটনের এই কৌশলের মূল শক্তি হচ্ছে মার্কিন অর্থনীতি ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব। অতীতে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ প্রয়োগ করেছে। ফলে অনেক দেশ ইরানের সঙ্গে লেনদেন কমাতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভিন্ন। কারণ, ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে চীন এবং রাশিয়া—যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও নানা কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়াকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মস্কোর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যাপক মার্কিন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে রাশিয়া অনেকাংশেই পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প পথ তৈরি করেছে। নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন, বিকল্প বাণিজ্যপথ এবং পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রাশিয়াকে নতুন নিষেধাজ্ঞার চাপ মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে প্রস্তুত করেছে।

ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কও গত কয়েক বছরে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের পাশাপাশি জ্বালানি, বাণিজ্য, পরিবহন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দুটি দেশের মধ্যে এই সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন যদি রাশিয়াকে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কমানোর জন্য চাপ দেয়, মস্কো সেই চাপ কতটা গ্রহণ করবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

চীনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা হিসেবে চীন তেহরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের রপ্তানি করা তেলের বড় অংশই চীনে যায়। ফলে চীন যদি ইরানের তেল কেনা অব্যাহত রাখে, তাহলে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানের অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দুর্বল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।

চীনের অনেক তেল শোধনাগার তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা বড় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও চীনা পক্ষ বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে বড় চীনা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিশানা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ এতে শুধু ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। একদিকে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখার জন্য চীনের সহযোগিতা প্রয়োজন, অন্যদিকে চীনের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান ইস্যুতে নতুন সংঘাত সৃষ্টি হলে তা বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

চীন এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরান সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। বেইজিং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। চীনের এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, দেশটি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সর্বোচ্চ চাপের নীতিকে সহজে সমর্থন করবে না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলায় ইরানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সরাসরি সংঘাত এড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

ইরানের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ব্রিকসকে ঘিরে। চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিলসহ উদীয়মান অর্থনীতির কয়েকটি দেশ নিয়ে গঠিত এই প্ল্যাটফর্মে ইরানও রয়েছে। পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প বাণিজ্য ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। ইরানও নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য এবং বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ সফল হলে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তেহরানের নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কোনো প্রভাব থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ব্যাংকিং, বীমা, জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেনে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ইরানের জন্যও নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করা সহজ হবে না। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি আমদানি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

তবে ইরান গত কয়েক দশকে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিভিন্ন কৌশল তৈরি করেছে। চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হলে তেহরান নতুন বিকল্প বাজার ও বাণিজ্যপথ ব্যবহার করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য যদি ইরানকে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়, সেটি বাস্তবায়ন করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও জটিল হতে পারে।

এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকেও হিসাব করতে হচ্ছে সম্ভাব্য পাল্টা প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি। চীন বা রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে তারা ইরানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে। এতে ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য অর্জনের পরিবর্তে তেহরান, বেইজিং ও মস্কোর মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করার ট্রাম্পের পরিকল্পনা শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সংঘাত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিকল্প শক্তিকেন্দ্র তৈরির প্রবণতা। ফলে ইরানকে চাপে ফেলতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে। আর এই দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে তেহরানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন পরিকল্পনা প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত