প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে লাইবেরিয়ার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জুয়েল হাওয়ার্ড-টেইলরের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মাদক পাচার, অর্থপাচারসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একটি আন্তর্দেশীয় মাদক পাচার নেটওয়ার্কের কার্যক্রম তদন্ত করতে গিয়ে তাঁর নাম সামনে আসে বলে জানিয়েছে লাইবেরিয়ার কর্তৃপক্ষ।
বুধবার রাজধানী মনরোভিয়ার রবার্টস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ফ্লাইটে ওঠার আগে হাওয়ার্ড-টেইলরকে আটক করা হয়। দেশটির বিচার মন্ত্রণালয় তাঁর আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ৬৩ বছর বয়সী এই সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে লাইসেন্স ছাড়া নিয়ন্ত্রিত মাদক আমদানি, বিক্রি ও পরিবহন, অবৈধ মাদক পাচার, অপরাধে প্ররোচনা এবং অপরাধ সংঘটনে সহায়তা। একই তদন্তের অংশ হিসেবে বিদেশি আরও তিন নাগরিকের বিরুদ্ধেও অনুপস্থিতিতে অভিযোগ আনা হয়েছে।
লাইবেরিয়ার পুলিশপ্রধান গ্রেগরি কোলম্যান জানিয়েছেন, গত মাসে জব্দ করা বিপুল পরিমাণ কোকেনের সঙ্গে হাওয়ার্ড-টেইলরের সম্ভাব্য যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, জব্দ করা কোকেনের আনুমানিক মূল্য ৩১৭ মিলিয়ন ডলার। তবে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি।
হাওয়ার্ড-টেইলরের আইনজীবী জানিয়েছেন, আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করবেন না তাঁরা। ফলে তদন্তের এই পর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। আইনগতভাবে তিনি অভিযোগের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন।
লাইবেরিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুধু সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টই নন, মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা অন্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। অভিযোগে থাকা তিন বিদেশি নাগরিকের মধ্যে দুজন ক্রোয়েশিয়ার এবং একজন ইউক্রেনের নাগরিক। তাঁদের বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে অভিযোগ আনা হয়েছে। লাইবেরিয়ার বিচারমন্ত্রী অসওয়াল্ড টুয়েহ জানিয়েছেন, তাঁদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লাইবেরিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছে। জুন ও জুলাইয়ে বড় দুটি মাদক চালান জব্দ হওয়ার পর দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান আরও বাড়িয়েছে। জুলাইয়ের অভিযানে প্রায় চার টন কোকেন জব্দ করা হয়। বিপুল পরিমাণ এই মাদক কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল, তা খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু করে কর্তৃপক্ষ।
লাইবেরিয়ার কর্মকর্তাদের ধারণা, জব্দ করা কোকেনের একটি বড় অংশ ইউরোপের বাজারে পাঠানোর জন্য নেওয়া হচ্ছিল। দেশটির ইতিহাসে এটিকে সবচেয়ে বড় মাদকবিরোধী অভিযানের অন্যতম হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ কোকেন জব্দের পাশাপাশি এই অভিযানের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক ও জটিল পাচার নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
এই তদন্তের পরিধি এখন শুধু মাদক পরিবহনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পাচার চক্রে অর্থের জোগানদাতা, সংগঠক, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহার করে কোনো ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লাইবেরিয়া সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, মাদক পাচারের সঙ্গে যারই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারের বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, কোনো সরকারি পদ বা রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখবে না। একইভাবে নাগরিকত্ব কিংবা রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এই অবস্থান দেশটির চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে সরকারের কঠোর মনোভাবেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জুয়েল হাওয়ার্ড-টেইলর লাইবেরিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। তিনি দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলরের সাবেক স্ত্রী। চার্লস টেইলর ১৯৯৭ সালে লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ২০০৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহীদের সহায়তার অভিযোগে একটি আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত বিশেষ আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১৯৯১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত চলা ওই যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারান।
চার্লস টেইলরের রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হওয়ার কয়েক বছর পর হাওয়ার্ড-টেইলর নিজেও সক্রিয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। সাবেক ফুটবলার ও রাজনীতিক জর্জ উইয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গড়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে আরও শক্ত অবস্থানে আসেন। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জর্জ উইয়া প্রেসিডেন্ট থাকাকালে হাওয়ার্ড-টেইলর লাইবেরিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাবেক একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ লাইবেরিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্ন রয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই মামলা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত হাওয়ার্ড-টেইলরের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
লাইবেরিয়ায় সাম্প্রতিক মাদকবিরোধী অভিযানের গুরুত্ব আরও বেড়েছে পশ্চিম আফ্রিকাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের পরিবর্তিত রুটের কারণে। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপে কোকেন পাচারের ক্ষেত্রে পশ্চিম আফ্রিকার কিছু দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। সমুদ্র ও আকাশপথে বিপুল পরিমাণ মাদক আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে পৌঁছানোর পর সেখান থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে পাঠানোর চেষ্টা করা হয় বলে বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে।
ভৌগোলিক অবস্থান, উপকূলীয় যোগাযোগ এবং সীমান্ত নজরদারির নানা সীমাবদ্ধতার কারণে পশ্চিম আফ্রিকার কিছু অঞ্চল মাদক পাচারকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের দেশগুলোতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। লাইবেরিয়ায় সাম্প্রতিক বড় চালান জব্দের ঘটনা সেই বৃহত্তর আন্তর্জাতিক মাদক পাচার পরিস্থিতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় তদন্তটি এখন আরও সংবেদনশীল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তদন্তকারীরা কোকেনের চালানের সঙ্গে কারা জড়িত, অর্থের উৎস কোথায়, কীভাবে মাদক পরিবহন করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর সঙ্গে কারা যুক্ত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে পাচারকারীরা কোনো সুবিধা পেয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
লাইবেরিয়া সরকার জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। এর ফলে মামলার পরিধি বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। দেশটির সাম্প্রতিক মাদকবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতায় সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তাই শুধু একটি ব্যক্তিকে ঘিরে আইনি পদক্ষেপ নয়; বরং আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে লাইবেরিয়ার আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বড় ধরনের পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।