রংপুরের চার খুনে উঠছে নতুন প্রশ্ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
রংপুরের চার খুনে উঠছে নতুন প্রশ্ন

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দুই তরুণকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তে পুলিশের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের একটি প্রাথমিক কারণ তুলে ধরা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তার দুজনের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং নিহতদের স্বজনদের প্রশ্নে ঘটনাটিকে ঘিরে নতুন করে নানা সংশয় তৈরি হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সরল প্রশ্ন—মাত্র দুজন তরুণ কি সত্যিই এত বড় ও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে, নাকি এর পেছনে আরও কেউ জড়িত রয়েছে? তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর পাওয়ার দাবি উঠেছে।

নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। শনিবার রাতে নগরের কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় নিজেদের বাড়ি থেকে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের চার সদস্যের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোক ও আতঙ্ক। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে।

ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত তদন্তে নামে এবং সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত পরিবারের সঙ্গে তাঁদের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে আদালতেও দুজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে ওঠেন। সেখানে তাঁরা মাদক সেবন করছিলেন বলে পুলিশের দাবি। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাঁদের বাধা দিলে তাঁকে গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতে তাঁকেও হত্যা করা হয়। এরপর মেয়ে আগামী এবং ঘরে ঘুমিয়ে থাকা কিশোর ছেলে আয়ুশকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশ আরও বলেছে, হত্যার পর ঘটনাটিকে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়, যাতে ঘটনাটি ডাকাতির মতো মনে হয়। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল থেকে মাদক সেবনের কিছু আলামতসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেন। পুলিশের দাবি, এসব আলামত এবং বিভিন্ন তথ্যের সূত্র ধরে সন্দেহভাজন দুই তরুণকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি গ্রেপ্তার দুজনের পরিবারের বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে। সিদ্ধার্থ দাসের মা পাপড়ি দাসের বক্তব্যে একদিকে ছেলের প্রতি মায়ের স্বাভাবিক উদ্বেগ, অন্যদিকে অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি মেনে নেওয়ার মানসিকতা ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর ধারণা, সঙ্গদোষে তাঁর ছেলে নষ্ট হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু তাঁর দাবি, তাঁর ছেলে আগে এমন ছিল না। তিনি নিজের সন্তান হলেও অপরাধী হলে তার শাস্তি চান।

মুগ্ধ দাসের মা সেনা রানী দাসও ছেলেকে নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঘটনার পর মুগ্ধের আচরণ তাঁর কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দুজন মানুষ মিলে কি এত বড় একটি ঘটনা ঘটাতে পারে? একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। নিহতদের স্বজনদের মধ্যেও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশের বক্তব্যের পাশাপাশি অন্য কোনো সম্ভাবনা আছে কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি উঠেছে।

গ্রেপ্তার দুই তরুণের বাড়িও নিহত পরিবারের বাড়ির খুব কাছাকাছি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিদ্ধার্থ নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের একটি টিনের ঘরে থাকতেন। মুগ্ধের বাড়িও ওই বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে। ফলে স্থানীয়দের কাছে তাঁদের পরিচিতি ও চলাফেরা অস্বাভাবিক ছিল না। ঘটনার পর এই নৈকট্যও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। নিহত পরিবারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের ধরন, ঘটনার আগে-পরে তাঁদের গতিবিধি এবং হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁরা ঠিক কোথায় ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটিও ছিল হৃদয়বিদারক। স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সন্দেহ তৈরি হয়। পরে বাড়িতে গিয়ে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে স্বজনরা বিষয়টি স্থানীয়দের জানান। জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান তাঁরা। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয় এবং একে একে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের একসঙ্গে চারজন সদস্যকে হারানোর এই ঘটনা স্বজনদের জন্য গভীর শোকের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী রংপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় শুরুতে অজ্ঞাতনামা আসামিদের কথা বলা হয়। পরে পুলিশ গ্রেপ্তার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। আদালতে তাঁদের জবানবন্দির পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন। সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্যের হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নগরীতে মাদকের বিস্তার ও মাদককেন্দ্রিক অপরাধ বন্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের দাবিও উঠেছে।

সব মিলিয়ে রংপুরের এই চার হত্যাকাণ্ডে পুলিশের তদন্তে একটি প্রাথমিক চিত্র সামনে এলেও ঘটনাটিকে ঘিরে প্রশ্ন পুরোপুরি শেষ হয়নি। দুই তরুণের স্বীকারোক্তি, ঘটনাস্থলের আলামত, তাঁদের সঙ্গে নিহতদের পূর্বপরিচয়, হত্যার উদ্দেশ্য এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না—সবকিছুই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে একটি পরিবারের চার সদস্যকে পরপর হত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনায় কেবল দুইজনের ভূমিকা ছিল, নাকি এর পেছনে আরও কোনো পরিকল্পনা বা সহযোগিতা ছিল, সেটি নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত যত এগোবে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও তত পরিষ্কার হওয়ার কথা। তবে যেকোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রমাণ, ফরেনসিক তথ্য, সাক্ষ্য এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য তদন্ত-উপাত্তের ভিত্তিতে সত্য উদ্‌ঘাটন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিহত পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও পুরো ঘটনার পেছনের সত্য প্রকাশ পাওয়াই এখন রংপুরবাসীর প্রধান প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত