যুদ্ধের মধ্যেই বড় গ্যাসের মজুত পেল ইরান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
যুদ্ধের মধ্যেই বড় গ্যাসের মজুত পেল ইরান

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধ এবং এর জেরে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই দেশটি নতুন একটি বড় প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের কর্মকর্তাদের দাবি, ফার্স প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চলে সন্ধান পাওয়া নতুন গ্যাসক্ষেত্রে ৭ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নতুন গ্যাসের মজুত আবিষ্কারের তথ্য জানান। তিনি বলেন, ফার্স প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। নতুন আবিষ্কৃত সম্পদের পরিমাণ দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে ইরান সরকার।

তেলমন্ত্রী জানান, নতুন গ্যাসক্ষেত্রের মোট মজুতের পরিমাণ ৭ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। এর মধ্যে আনুমানিক ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হবে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই মজুতের পরিমাণ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্সের একটি পর্যায়ে প্রায় ১৫ বছরের উৎপাদনের সমপরিমাণ।

ইরানের জন্য এই আবিষ্কার এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশটির জ্বালানি খাত দীর্ঘদিনের নানা সংকটের পাশাপাশি সাম্প্রতিক যুদ্ধের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যার কারণে যুদ্ধের আগেই ইরানের জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি হয়েছিল। এর সঙ্গে যুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইরানের গ্যাস খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর একটি হলো সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এই বিশাল গ্যাসক্ষেত্রটি কাতারের নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে একই ভূতাত্ত্বিক মজুতের অংশ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাসসম্পদ হিসেবে পরিচিত এই ক্ষেত্র ইরানের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় সাউথ পার্সসহ ইরানের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এসব হামলার কারণে ইরানের দৈনিক গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও পরবর্তী সময়ে কিছু উৎপাদন সক্ষমতা পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে, তারপরও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

যুদ্ধের কারণে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়ছে। শীত মৌসুমে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যে সরকার ইতোমধ্যে ঘাটতির সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করেছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফলে নতুন গ্যাসের মজুতের সন্ধান ইরানের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা এলেও এর সুফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে না। ইরানের তেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব নতুন সম্পদ উত্তোলনের কাজ শুরু করতে চায় সরকার। কিন্তু একটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে সাধারণত দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। অনুসন্ধান, মজুতের বিস্তারিত মূল্যায়ন, কূপ খনন, উৎপাদন অবকাঠামো নির্মাণ এবং পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো বিভিন্ন ধাপ পেরোতে হয়।

এ ছাড়া ইরানের ওপর দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও বড় বাধা হয়ে থাকতে পারে। জ্বালানি খাতে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত যন্ত্রপাতি ও বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকায় ইরানকে অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হয়। যুদ্ধের কারণে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ইরানের অর্থনীতির জন্য জ্বালানি খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বড় প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলসম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন, পরিবহন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগের ঘাটতি এই সমস্যাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করেছে।

নতুন আবিষ্কৃত গ্যাসের মজুত যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী উত্তোলন করা সম্ভব হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ইরানের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিশেষ করে শীতকালে গৃহস্থালি ও শিল্প খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়লে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলে জ্বালানি সংকট কিছুটা কমতে পারে।

ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তার প্রভাব পড়ে। এর ফলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিতে পারে। নতুন গ্যাসসম্পদ দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে আশা করছে তেহরান।

তবে যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে জ্বালানি খাতকে পুনর্গঠন করাই এখন ইরানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ফলে শুধু উৎপাদন ক্ষমতা কমেনি, অনেক অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনও তৈরি হয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের পাশাপাশি পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পুনরুদ্ধার করতে হবে।

এ অবস্থায় নতুন আবিষ্কারকে ইরান সরকার একটি সম্ভাবনার জানালা হিসেবে দেখছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট যখন তীব্র হচ্ছে, তখন বড় একটি গ্যাসসম্পদের সন্ধান ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা আশাবাদ তৈরি করতে পারে। তবে এই সম্পদ বাস্তবে কত দ্রুত দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যবস্থায় অবদান রাখতে পারবে, তা নির্ভর করবে উন্নয়নকাজের গতি, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আঞ্চলিক জ্বালানি রাজনীতি। ইরান ও কাতার একই বিশাল ভূগর্ভস্থ গ্যাসসম্পদের অংশীদার। সাউথ পার্স ও নর্থ ডোম ঘিরে দুই দেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে। নতুন গ্যাসসম্পদের সন্ধান ইরানের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর সঙ্গে আঞ্চলিক বাজার ও ভূরাজনীতির বিষয়ও যুক্ত থাকবে।

বিশ্বের জ্বালানি বাজারেও ইরানের বিশাল গ্যাস ও তেলসম্পদ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে দেশটির রপ্তানি সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে যদি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের অংশগ্রহণ বাড়ে, তাহলে নতুন গ্যাসসম্পদ দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। নতুন আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রের অবকাঠামো নিরাপদ রাখা, বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা তখন কঠিন হবে। তাই শুধু গ্যাসের মজুত পাওয়া নয়, সেটিকে কার্যকর সম্পদে পরিণত করাই ইরানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ইরানের তেলমন্ত্রী দ্রুত উৎপাদন শুরুর ইচ্ছা প্রকাশ করলেও বাস্তবে এর জন্য কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। এই সময়ের মধ্যে দেশটির জ্বালানি খাতকে যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হবে এবং নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শীতকালীন সম্ভাব্য গ্যাস সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করতে হবে।

সব মিলিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যেও নতুন গ্যাসসম্পদের সন্ধান ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর। একদিকে দেশটি জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি, অন্যদিকে নতুন এই আবিষ্কার ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে মাটির নিচে থাকা বিপুল সম্পদকে মানুষের ঘরে আলো ও উষ্ণতা এবং শিল্পের উৎপাদনে রূপান্তর করতে হলে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও বিনিয়োগ সংকট—সবকিছুর মোকাবিলা করতে হবে।

নতুন গ্যাসক্ষেত্রটি শেষ পর্যন্ত ইরানের জ্বালানি সংকট কতটা কমাতে পারবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে ৭ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের বেশি সম্ভাব্য মজুতের এই আবিষ্কার যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত