প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় অন্তত ৯০টি ব্রিজ ও কালভার্টের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও এসব স্থাপনার মুখ বন্ধ করে বাড়ি ও ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও পুকুর খনন করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। আবার কিছু ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙে পড়ায় স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এতে ফসলহানির পাশাপাশি প্রায় ২ হাজার ৮৫০ বিঘা জমি অনাবাদি পড়ে থাকছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের তদারকির অভাব, প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে পানি চলাচলের পথগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা দ্রুত অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজ-কালভার্ট সংস্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলার আটটি ইউনিয়ন পরিষদের ৭২টি ওয়ার্ডের মধ্যে অন্তত ৬৫ জন ওয়ার্ড সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পারইল ইউনিয়নে ১৪টি, একডালায় ১০টি, কালীগ্রামে ১৮টি, বড়গাছায় ১৯টি, খট্টেশ্বর রাণীনগরে ১১টি, কাশিমপুরে সাতটি, মিরাটে তিনটি এবং গোনা ইউনিয়নে আটটি ব্রিজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু বড়গাছা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডেই ১১টি ব্রিজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ রয়েছে।
দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় রাণীনগর উপজেলায় ৬২১টি এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন দপ্তরের আওতায় ৯৩৮টি ব্রিজ-কালভার্ট রয়েছে। সব মিলিয়ে উপজেলায় এসব স্থাপনার সংখ্যা ১ হাজার ৫৫৯টি।
ঘোষগ্রাম পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সাত্তার বলেন, পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় তাঁর দেড় বিঘা জমিতে এবার ধান রোপণ করা সম্ভব হয়নি। একই গ্রামের কৃষক আবদুল মালেক জানান, তাঁর তিন বিঘা জমি পানির নিচে রয়েছে। ঘোষগ্রাম, শাহপাড়া, হিন্দুপাড়া ও মাঝিপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের কৃষকের জমিও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি বের হতে না পারায় তাঁর বোনের বাড়িতেও পানি ঢুকে পড়েছে বলে জানান তিনি।
সরেজমিনে রাণীনগর-আত্রাই সড়কের ঘোষগ্রাম বাঘারপুকুর এলাকায় দেখা যায়, স্থানীয় আসকান আলী একটি কালভার্টের মুখ আংশিক বন্ধ করে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। এতে মাঠের পানি বের হতে না পেরে দেড় শতাধিক বিঘা জমি পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।
ভবন নির্মাণকারী আসকান আলী বলেন, ভবনের নিচ দিয়ে পানি চলাচলের জন্য জায়গা রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, সড়কের মাঝখানে কালভার্টটি ভেঙে দেবে যাওয়ায় পানি চলাচল বন্ধ হয়েছে।
স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য ইউনুস আলী বলেন, পানি বের হতে না পারায় ৪০০ থেকে ৫০০ বিঘা জমি জলাবদ্ধ হয়ে আছে এবং কয়েকশ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।
বড়গাছা ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য অনিমেষ চন্দ্র জানান, শলিয়া গ্রামের পশ্চিমে মাঠের পানি নামার একমাত্র কালভার্টের মুখ মাটি দিয়ে ভরাট করে বন্ধ করে দিয়েছেন স্থানীয় ওয়াহেদ আলী। এতে প্রায় এক হাজার বিঘা জমির আবাদ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অভিযুক্ত ওয়াহেদ আলী বলেন, পানি নামার জন্য কিছুটা জায়গা রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, এতে তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
অন্যদিকে, কুবরাতলী-গোনা সড়কের গোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গত বছর প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই ব্রিজের মুখ বন্ধ করে মাছ চাষ করছেন জাহাঙ্গীর আলম। এতে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মাঠের পানি তাঁর পুকুরে এসে পড়ে এবং এতে সাত-আট লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। তাই সাময়িকভাবে ব্রিজের মুখ বন্ধ করেছেন। পানি বেশি হলে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি তুলে দেন বলেও জানান তিনি।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ব্রিজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ থাকায় প্রতি বর্ষা মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৮৫০ বিঘা জমি অনাবাদি থেকে যাচ্ছে। এতে কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
রাণীনগর এলজিইডির কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর কয়েকটি ব্রিজ-কালভার্টের মুখ খুলে দেওয়া হয়েছে। বাকি সমস্যাগুলোও পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান বলেন, কয়েকটি অভিযোগ সরেজমিন তদন্ত করে সমাধান করা হয়েছে। অন্যান্য ব্রিজ-কালভার্টের অবস্থাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ভেঙে যাওয়া ব্রিজ-কালভার্ট সংস্কার বা প্রয়োজনে নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।