ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসেই নেপালের ভয়াবহ বন্যা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪৫ বার
ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসেই নেপালের ভয়াবহ বন্যা

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় বুধবার যে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ নেমে এসেছে, তার পেছনে ভূমিকম্প নয়, বরং হিমবাহ ধস ও এর সঙ্গে নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত দায়ী বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থলে ভূমিকম্পের কম্পন শনাক্ত করা হলেও পরে তথ্য সংশোধন করে সংস্থাটি জানায়, সেখানে কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। বরং হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকেই ভূকম্পনসদৃশ সংকেত তৈরি হয়েছিল এবং এর পরেই নদীপথে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে।

বুধবার সকালে নেপালের কাঠমান্ডুর উত্তরে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প শনাক্ত হওয়ার কথা জানায় ইউএসজিএস। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে শনাক্ত হওয়া সেই কম্পন নিয়ে প্রথমে ভূমিকম্পের ধারণা তৈরি হলেও পরে উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি অবস্থান পরিবর্তন করে। ইউএসজিএস জানায়, শনাক্ত হওয়া ভূকম্পনটি আসলে বরফ ও পাথর নিয়ে বড় ধরনের ভূমিধস এবং পরবর্তী ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।

ঘটনার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয় উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণের পর। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লহেন্দে নদীর এলাকায় বড় একটি বরফ ও পাথরের ধস নেমে আসে। সেই ধসের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নদীতে গিয়ে পড়ায় অল্প সময়ের মধ্যে পানির প্রবাহ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। লহেন্দে নদী ভোতে কোশি নদীর একটি শাখা হওয়ায় ধ্বংসাবশেষে পরিপূর্ণ পানির প্রবল স্রোত দ্রুত ভাটির দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে ভোতে কোশি নদীতেও আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। পাহাড়ি নদীর সরু ও দুর্গম উপত্যকা দিয়ে দ্রুতগতিতে নেমে আসা পানি, কাদা ও পাথরের স্রোত পথের মধ্যে থাকা ঘরবাড়ি, যানবাহন, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কোথাও কোথাও পুরো স্থাপনা কাদার নিচে চাপা পড়ে যায়। পাহাড়ি অঞ্চলে এমন আকস্মিক স্রোতের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, সতর্ক হওয়ার জন্য মানুষের হাতে খুব কম সময় থাকে। বুধবারের ঘটনাতেও অনেক বাসিন্দা কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রবল স্রোতের মুখে পড়েন।

নেপালের পুলিশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাবে বুধবার রাত পর্যন্ত ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। বৃহস্পতিবার নতুন করে হতাহতের তথ্য আসায় মৃতের সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, ততই ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নিচ থেকে নতুন মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

দুর্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান করা। নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত রাসুওয়া, ধাদিং, নুওয়াকোটসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিবারগুলো স্বজনদের খোঁজে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছেন। যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেকের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কোথাও বিদ্যুৎ নেই, কোথাও মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল। ফলে কে কোথায় আছেন, কে নিরাপদে আছেন এবং কারা নিখোঁজ—তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

পর্যটকরাও এই দুর্যোগে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েকশ পর্যটকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। ভারতীয় নাগরিকদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও অন্যান্য দেশের নাগরিকও নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলটি তিব্বতের কৈলাস-মানসসরোবর যাত্রা এবং পাহাড়ি পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় দুর্যোগের সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক ভ্রমণকারী অবস্থান করছিলেন।

উদ্ধারকাজে নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক জায়গায় স্থলপথে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। জীবিতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে থাকা মানুষ এবং মরদেহ উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা।

দুর্যোগের প্রভাব শুধু নেপালেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং এলাকাতেও ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রাথমিক তথ্যে সেখানে কয়েকজনের মৃত্যুর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছে। দুই দেশের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় সড়ক, সেতু ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

ঘটনার বিভিন্ন ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় দুর্যোগের আকস্মিকতার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রথমে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে। এরপর কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ মিশ্রিত বিশাল স্রোত দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে রাস্তা ও স্থাপনা পানির নিচে চলে যায়। অনেক যানবাহন স্রোতে ভেসে যায় এবং বহু স্থাপনা কাদার নিচে চাপা পড়ে। পাহাড়ি উপত্যকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত থাকে।

বিজ্ঞানীদের কাছে ঘটনাটি হিমালয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। হিমবাহ, খাড়া পাহাড়ি ঢাল এবং নদীর প্রবাহ একসঙ্গে কাজ করলে অল্প সময়ের মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী ধ্বংসাত্মক স্রোত তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে পড়লে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর নদীতে পড়ে পানির প্রবাহকে হঠাৎ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে কাদা ও পাথর যুক্ত হলে তা সাধারণ বন্যার তুলনায় অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে।

তবে এই ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটা ছিল, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। হিমালয় অঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধি ও হিমবাহের পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট হিমবাহ ধসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি দায়ী ছিল কি না, তা নির্ধারণ করতে আরও উপাত্ত, উপগ্রহচিত্র ও মাঠপর্যায়ের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

এদিকে উদ্ধারকাজ চলার মধ্যেই নতুন করে কোনো ধস বা নদীপথে পানি আটকে থাকার কারণে দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বন্যা হতে পারে কি না, সেটিও নজরে রাখা হচ্ছে। পাহাড়ি নদীতে ধ্বংসাবশেষ জমে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি হলে পরে সেটি ভেঙে আবারও প্রবল স্রোত সৃষ্টি করতে পারে। ফলে উদ্ধারকারী দলগুলোকেও একদিকে নিখোঁজদের সন্ধান চালাতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, দুর্গতদের উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সরকারের সব ধরনের সম্পদ ব্যবহার করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয় পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি নিখোঁজদের সন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এই ভয়াবহ দুর্যোগ আবারও দেখিয়ে দিল, হিমালয়ের মতো ভূপ্রাকৃতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকায় আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ কতটা দ্রুত একটি জনপদকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। প্রথমে ভূমিকম্প মনে হলেও ইউএসজিএসের পরবর্তী বিশ্লেষণে প্রকৃত কারণ হিসেবে হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের বিষয়টি সামনে এসেছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে নিখোঁজদের সন্ধান, জীবিতদের উদ্ধার এবং দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পাহাড়ি নদী ও হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে দুর্যোগ তথ্য বিনিময় আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com