জার্মান সরকারি কর্মীদের বিদেশে বসে কাজের সুযোগ

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৭ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জার্মানির সরকারি চাকরিজীবীরা এখন দেশের বাইরে ইউরোপের বিভিন্ন সমুদ্রসৈকতে বসেও বছরে সর্বোচ্চ আট সপ্তাহ পর্যন্ত দাপ্তরিক কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। ‘মায়োর্কা নিয়ম’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থার আওতায় কর্মীরা বিদেশে অবস্থান করেও নিজ নিজ দপ্তরের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে জার্মানির প্রভাবশালী ট্যাবলয়েড বিল্ডের এক প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জার্মানির ফেডারেল মোটর ট্রান্সপোর্ট অথরিটি এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি সুবিধা দিচ্ছে। এই বিভাগের কর্মীরা বিদেশে অবস্থান করে সর্বোচ্চ ৪০ দিন পর্যন্ত রিমোট ওয়ার্কিং করতে পারেন। ফলে সরকারি পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তাদের স্পেন, ইতালি কিংবা গ্রিসের মতো দেশের সৈকত থেকেও নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশেই নয়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরেও থেকে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ কানাডা, থাইল্যান্ড কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সফরে গেলেও কিছু কর্মী দূর থেকে অফিসের দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারেন।

তথ্য নিরাপত্তা অফিসসহ অন্যান্য কিছু বিভাগেও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে ১০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত বিদেশে থেকে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তবে সব সরকারি বিভাগে একই নীতি প্রযোজ্য নয়। যেমন মার্কেট কম্পিটিশন রেগুলেশন বিভাগে বিদেশে অবস্থান করে কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বিল্ডের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে জার্মান সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ‘মায়োর্কা নিয়ম’ বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিদেশ থেকে কাজসহ হোম অফিসের প্রচলিত নিয়মগুলো পর্যালোচনা করছে।

সরকারি কর্মীদের বিদেশে বসে কাজ করার এই সুবিধার তীব্র সমালোচনা করেছে জার্মানির পুলিশ ইউনিয়ন। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাইকো টেগাটজের মতে, একই ধরনের সরকারি কর্মীদের কেউ বিদেশে বসে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন, আবার কেউ সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন—এটি অন্যায্য এবং বৈষম্যমূলক। তিনি দ্রুত এই ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।

তবে সরকারি চাকরিজীবীদের ইউনিয়ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, আধুনিক কর্মপরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মোবাইল ওয়ার্কিংয়ের নিয়ম আরও শিথিল করা উচিত।

করোনা মহামারির সময় জার্মানির সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দূরবর্তী কাজের প্রবণতা দ্রুত বেড়ে যায়। মহামারি শেষ হওয়ার পরও সেই কর্মসংস্কৃতির একটি অংশ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চালু রয়েছে। বিদেশ থেকে কাজের সুযোগও সেই পরিবর্তিত কর্মপরিবেশেরই একটি সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই নমনীয় কর্মসংস্কৃতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও বাড়ছে। জার্মানির বর্তমান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও পেনশন ব্যবস্থার চাপ মোকাবিলায় আরও বেশি কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, জার্মানির অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধরে রাখতে কর্মীদের আরও দীর্ঘ সময় ও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।

জার্মানি বর্তমানে জ্বালানির উচ্চমূল্য, মোটরগাড়ি শিল্পের দুর্বলতা এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দ্রুত বয়স্ক হয়ে পড়ার মতো একাধিক অর্থনৈতিক ও জনমিতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ফলে সরকারি কর্মীদের একটি অংশকে দীর্ঘ সময় বিদেশে থেকে কাজের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

এ ধরনের বিতর্ক অবশ্য শুধু জার্মানিতেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্যেও সরকারি কর্মীদের বিদেশে বসে কাজ করা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ট্যাক্সপেয়ার্স অ্যালায়েন্সের এক অনুসন্ধানে দাবি করা হয়, যুক্তরাজ্যের শত শত সরকারি কর্মকর্তা গ্রিস ও স্পেনের মতো দেশ থেকে কাজ করছেন।

তবে যুক্তরাজ্যের ক্যাবিনেট অফিস জানিয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া সরকারি কর্মীদের বিদেশ থেকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয় না। পরিবারের সদস্যের অসুস্থতা বা মৃত্যুর মতো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এ ধরনের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।

ট্যাক্সপেয়ার্স অ্যালায়েন্সের তদন্ত প্রচার ব্যবস্থাপক ক্যালাম ম্যাকগোল্ডরিক এই ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাজ্যের সরকারি সেবা যখন নানা সংকটে রয়েছে, তখন সরকারি কর্মীদের স্পেন, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ব্রাজিলের মতো দূরবর্তী দেশ থেকে কাজের অনুমতি দেওয়া নমনীয় কর্মনীতির সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

জার্মানিতে ‘মায়োর্কা নিয়ম’ নিয়ে বিতর্কের মূল প্রশ্নও এখন একই—দূরবর্তী ও নমনীয় কাজের সুবিধা কি কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে, নাকি সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বৈষম্য ও প্রশাসনিক ঝুঁকি তৈরি করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ম বাতিলের সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য দপ্তরে নীতিমালা পর্যালোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে জার্মান সরকারও নতুন করে অবস্থান নির্ধারণ করছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত