৬৪ জেলায় সার মনিটরিং সেল, মজুদেও স্বস্তি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪১ বার
৬৪ জেলায় সার মনিটরিং সেল, মজুদেও স্বস্তি

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের কৃষকদের জন্য সার সরবরাহ নির্বিঘ্ন ও সুশৃঙ্খল রাখতে দেশের ৬৪ জেলায় সার মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু। তিনি বলেছেন, সার ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য সংকট, অনিয়ম কিংবা সরবরাহজনিত সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এসব মনিটরিং সেল কাজ করছে।

বুধবার জাতীয় সংসদে সারসংকট নিয়ে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার সময় প্রতিমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নজিবুর রহমান কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধিতে আলোচনার সূচনা করলে তিনি সরকারের সার ব্যবস্থাপনা ও মজুদের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা আরও উন্নত এবং কার্যকর করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। কৃষকের কাছে প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত সার পৌঁছে দেওয়া এবং সার বিতরণে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হলে তা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যেই জেলা পর্যায়ে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সারের মোট চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার টন। এর বিপরীতে মজুদ রয়েছে প্রায় ৫১ লাখ ৭১ হাজার টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় দেশে প্রায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টন সার উদ্বৃত্ত থাকার কথা জানিয়েছে সরকার। ফলে সার নিয়ে সামগ্রিকভাবে ঘাটতির আশঙ্কা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে শুধু পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেই কৃষকের দুশ্চিন্তা পুরোপুরি দূর হয় না। সার উৎপাদন বা আমদানির পর সেটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সময়মতো পৌঁছানো, ন্যায্য মূল্যে বিক্রি এবং প্রকৃত কৃষকের হাতে সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মনিটরিং সেলগুলোকে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রাখার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি জানান, দেশের প্রতিটি সার মনিটরিং সেল দুজন করে যুগ্মসচিব ও উপসচিবের তত্ত্বাবধানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশের যেকোনো স্থান থেকে সারসংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট মনিটরিং সেল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো সমস্যা তৈরি হলে সেটি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই সমাধানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও সংসদে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের মাধ্যমেই এত দিন সার ডিলারশিপ পরিচালিত হয়ে আসছিল। এসব ডিলারের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯ জন বর্তমানে দেশের বাইরে বা নিজ নিজ এলাকায় অনুপস্থিত থাকায় তাদের নিয়ন্ত্রিত জায়গাগুলোতে ডিলারশিপ শূন্য হয়ে পড়েছে।

এই শূন্যতা পূরণে ইউনিয়ন পর্যায়ে নতুন করে ৪ হাজার ৯১৮ জন ডিলার নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। নতুন ডিলার নিয়োগের পর প্রত্যেক ডিলার ইউনিয়ন পর্যায়ে আরও দুজন করে অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগ করবেন বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর প্রত্যাশা, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর পথ আরও সহজ হবে এবং বিতরণব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বাড়বে।

সার নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের উত্থাপিত অভিযোগের জবাবও দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে আমন ধান পাকার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এই সময়ে কৃষকদের মধ্যে সারের ব্যাপক চাহিদা থাকার কথা নয়। তবে অনেক কৃষক আসন্ন বোরো মৌসুমের জন্য আগেভাগে সার কিনে রাখার চেষ্টা করছেন। এর ফলে বিশেষ করে নন-ইউরিয়া সারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সার ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনা দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করছে—বিরোধী দলের এমন অভিযোগেরও সমালোচনা করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এখনো নতুন ডিলার নিয়োগ দেয়নি এবং ডিলার নিয়োগের জন্য আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ১০ সেপ্টেম্বর। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই দুর্নীতির অভিযোগ তোলার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু। তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্টরা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে এবং বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশ তারা পছন্দ করছে না। একই সঙ্গে সরকারবিরোধী কোনো ষড়যন্ত্র বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে না জড়াতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিরোধী দলও লাভবান হবে না।

কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর বিষয়টিও সংসদে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষক কার্ড চালু করা কৃষকদের জন্য সম্মানের বিষয়। শুরুতে বিরোধী দল বিভিন্নভাবে এই উদ্যোগের সমালোচনা করলেও এখন তারা বুঝতে পারছে যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

আলোচনায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও দেশের সার মজুদের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশে বর্তমানে সারের মজুদ পর্যাপ্ত রয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউরিয়ার মজুদ রয়েছে ৪ লাখ ১৮ হাজার টন। একই সময়ে ট্রিপল সুপার ফসফেট বা টিএসপি রয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন, ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি ৩ লাখ ২ হাজার টন এবং মিউরিয়েট অব পটাশ বা এমওপি রয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ টন।

শুধু দেশের গুদামেই নয়, পরিবহনের পথেও বিপুল পরিমাণ সার রয়েছে বলে জানান তিনি। পরিবহনের পথে রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ২০০ টন টিএসপি, ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ টন ডিএপি এবং ১ লাখ ৮৯ হাজার ৪০০ টন এমওপি। ফলে সামনে কৃষি মৌসুমে সার সরবরাহ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম বলে মনে করছে সরকার।

সার বিতরণব্যবস্থায় বর্তমানে ১ হাজার ১০৫ জন মূল ডিলার এবং ৩১ হাজার ৬০০ জন খুচরা ডিলার রয়েছেন বলেও সংসদে জানানো হয়। ভবিষ্যতে আরও ৮ হাজার ৬৮৭ জন নতুন ডিলার এবং ১৬ হাজার খুচরা ডিলার নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। এসব নিয়োগ সম্পন্ন হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সার সরবরাহ আরও সহজ ও দ্রুত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নতুন ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’ নিয়েও সংসদে আলোচনা হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সার ব্যবস্থাপনা কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগের জবাবে মীর শাহে আলম বলেন, ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় সার ব্যবস্থাপনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হতে আগ্রহী নন। তাঁর দাবি, নতুন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে তৃণমূল পর্যায়ে সার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা কমে আসবে।

কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানো দেশের খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি কিংবা অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু কৃষকের আয়েই পড়ে না, বাজারদর ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেও এর প্রভাব পড়ে। তাই সরকারের মজুদ পরিস্থিতি ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর কৃষকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ রয়েছে।

এই বাস্তবতায় ৬৪ জেলায় মনিটরিং সেল গঠন এবং পর্যাপ্ত মজুদের তথ্য কৃষকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে এই মজুদ কতটা কার্যকরভাবে বিতরণ করা হচ্ছে, কৃষক ন্যায্য মূল্যে সার পাচ্ছেন কি না এবং নতুন ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ থাকে—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত সরকারের উদ্যোগের সফলতা নির্ধারণ করবে।

সরকারের পক্ষ থেকে সার ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার যে উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, তার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষকের প্রয়োজনের সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থার কার্যকর সমন্বয়। কৃষি মৌসুমে কোনো এলাকায় আকস্মিক চাহিদা বাড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, অভিযোগের প্রতিকার করা এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অনিয়ম ঠেকানো গেলে সার ব্যবস্থাপনায় কৃষকের আস্থা আরও বাড়বে। ৬৪ জেলার মনিটরিং সেল সেই দায়িত্ব কতটা দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে কৃষক ও সংশ্লিষ্ট মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত