জনবল সংকটে বন্ধ দুই উপকেন্দ্র, বিপাকে খামারিরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৬ বার
জনবল সংকটে বন্ধ দুই উপকেন্দ্র, বিপাকে খামারিরা

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন বহু পরিবারের জীবিকা ও আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। বিশেষ করে তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট ও মাঝারি আকারের গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগির খামার। কিন্তু বিপুল এই প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য সরকারি চিকিৎসাসেবা দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। তীব্র জনবল সংকটে উপজেলার প্রাণিসম্পদ দপ্তরের দুটি উপকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার খামারি ও কৃষকদের অসুস্থ পশু নিয়ে উপজেলা সদরে ছুটতে হচ্ছে, আর অনেকেই বাধ্য হয়ে হাতুড়ে চিকিৎসক কিংবা অনভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শের ওপর নির্ভর করছেন।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। এসব এলাকার প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনের সঙ্গে যুক্ত। তিস্তার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে কৃষিকাজের পাশাপাশি পশুপালন অনেক পরিবারের বিকল্প ও প্রধান আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে শত শত মিনি ডেইরি ও ছাগলের খামার। পশুর দুধ বিক্রি, বাছুর ও ছাগল লালন-পালন এবং হাঁস-মুরগি বিক্রির মাধ্যমে পরিবারগুলো সংসারের ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পশুর রোগবালাই দেখা দিলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরামর্শ না পাওয়ায় তাদের সেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের মঞ্জুরীকৃত পদ রয়েছে ১১টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র পাঁচজন। তাদের মধ্যে একজন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, একজন ভেটেরিনারি সার্জন, একজন সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, একজন ড্রেসার এবং একজন অফিস সহায়ক। এত বড় একটি উপজেলার প্রাণিসম্পদ চিকিৎসা, টিকাদান, খামারি প্রশিক্ষণ, রোগ প্রতিরোধ ও ডেইরি উন্নয়ন কার্যক্রম মাত্র পাঁচজনের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে নিয়মিত সেবা দিতে গিয়ে কর্মকর্তাদের একদিকে অফিসের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে জরুরি প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ে ছুটতে হচ্ছে।

জনবল সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বামনডাঙ্গা ও ধর্মপুর উপকেন্দ্রে। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় দুটি উপকেন্দ্রই কার্যত বন্ধ রয়েছে। এসব এলাকার খামারিদের এখন পশু চিকিৎসার জন্য ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হচ্ছে। অসুস্থ গরু, ছাগল কিংবা অন্য কোনো পশুকে এত দূরের পথ পার করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না। বিশেষ করে চরাঞ্চলের কাঁচা রাস্তা, নদী ও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে জরুরি সময়ে এই দূরত্ব আরও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বামনডাঙ্গার খামারি নজরুল ইসলাম এবং ধর্মপুর এলাকার মো. ইউনিট মিয়াসহ স্থানীয় কয়েকজন খামারি জানান, আগে কাছাকাছি উপকেন্দ্রে পশু নিয়ে গেলে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়া যেত। এখন উপকেন্দ্র বন্ধ থাকায় উপজেলা সদরে যেতে হয়। অসুস্থ পশুকে দূরে নিয়ে যাওয়ার সময় তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে পশু পরিবহনের ব্যবস্থাও থাকে না। ফলে চিকিৎসা করানোর আগেই রোগ ছড়িয়ে পড়া বা পশু মারা যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

তিস্তার চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ আরও বেশি। হরিপুর ডাঙ্গার চরের খামারি জরিফ মিয়ার অভিযোগ, চরে কোনো পশু অসুস্থ হলে চিকিৎসকের সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও দ্রুত সাড়া পাওয়া যায় না। পরে উপজেলা সদরে পশু নিয়ে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু চরাঞ্চলের বাস্তবতায় অসুস্থ বড় গরু কিংবা একাধিক পশুকে এত দূরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। ফলে অনেক খামারি স্থানীয়ভাবে পাওয়া ব্যক্তিদের পরামর্শে পশুর চিকিৎসা করাতে বাধ্য হন।

খামারিদের ভাষ্য, পশুপালনের ব্যয়ও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। গোখাদ্য, ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমিত পুঁজির খামারিদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে পশুর কোনো রোগ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ে। একটি গরু বা দুধেল গাভি অসুস্থ হয়ে পড়লে শুধু চিকিৎসা ব্যয় নয়, দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া, ওজন কমা কিংবা শেষ পর্যন্ত পশুটি মারা যাওয়ার কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন খামারিরা।

রামভদ্র খানের খামারি মামুন মিয়া জানান, খামার পরিচালনা এখন আগের তুলনায় অনেক কঠিন। পশুর রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হলেও অনেক সময় দপ্তরের লোকজনকে পাওয়া যায় না। জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট কর্মী না পাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ নিতে হয়। এতে সঠিক চিকিৎসার পরিবর্তে ভুল ওষুধ প্রয়োগের ঝুঁকি তৈরি হয়।

সুন্দরগঞ্জ পৌর এলাকার দীর্ঘদিনের খামারি বিদ্যুৎ চন্দ্র সরকারও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। প্রায় এক দশক ধরে গরু পালন করছেন তিনি। তার মতে, নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও প্রয়োজনীয় সময়ে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কর্মকর্তারা সরকারি কাজে মাঠে বা অন্যত্র থাকলে হাসপাতালে গিয়ে অনেক সময় চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে আসতে হয়। সময়মতো টিকা না পাওয়ার কারণেও পশুর রোগঝুঁকি বাড়ছে বলে তিনি মনে করেন।

প্রাণিসম্পদ চিকিৎসাসেবার এই ঘাটতি শুধু খামারিদের ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। সুন্দরগঞ্জের মতো কৃষিনির্ভর এলাকায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি পরিবার যখন গরু বা ছাগল পালন করে, তখন তার সঙ্গে গোখাদ্য বিক্রেতা, শ্রমিক, পশুর ওষুধের দোকানদার, দুধ সংগ্রহকারীসহ আরও অনেক মানুষের আয় জড়িত থাকে। রোগবালাইয়ের কারণে পশুসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ে।

বেলকা বাজারের পল্লী চিকিৎসক রাজেন্দ্র কুমার সরকার দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে পশু চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত। তার মতে, আধুনিক ও খামারভিত্তিক পশু চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত সরকারি চিকিৎসকের বিকল্প নেই। স্থানীয়ভাবে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কেউ কিছুটা সেবা দিতে পারলেও জটিল রোগ শনাক্তকরণ, সঠিক ওষুধ নির্ধারণ, টিকা ব্যবস্থাপনা এবং রোগ প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক পরামর্শের প্রয়োজন রয়েছে। খামারের সংখ্যা ও পশুর পরিমাণের তুলনায় সরকারি চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই কম হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মোজাম্মেল হকও জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, মাত্র পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে এত বড় উপজেলার প্রাণিসম্পদ খাতের চিকিৎসাসেবা চালিয়ে নেওয়া কঠিন। জরুরি প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ে যেতে হলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অপেক্ষা করতে হয়। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কার্যক্রমও নিয়মিত চালিয়ে যেতে হয়। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে সব জায়গায় একসঙ্গে সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

সদ্য যোগদান করা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কে এম ইফতেখারুল ইসলামও সুন্দরগঞ্জের বাস্তবতায় দ্রুত জনবল বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, উপজেলা হিসেবে সুন্দরগঞ্জের আয়তন ও জনসংখ্যা বড় এবং এখানে প্রাণিসম্পদের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। সে তুলনায় বিদ্যমান জনবল অত্যন্ত কম। শতভাগ প্রাণিসম্পদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত শূন্য পদে জনবল নিয়োগের পাশাপাশি বন্ধ থাকা উপকেন্দ্রগুলো কার্যকর করা প্রয়োজন।

স্থানীয় খামারিদের প্রত্যাশা, শুধু উপজেলা সদরের হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবা নয়, চর ও প্রত্যন্ত ইউনিয়নগুলোতেও নিয়মিত ভেটেরিনারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা, টিকাদান ও রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পশুর মৃত্যু ও খামারিদের আর্থিক ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে। জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে যে সেবার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত দূর করা না গেলে সুন্দরগঞ্জের সম্ভাবনাময় প্রাণিসম্পদ খাত আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত