বিগত সরকারের দুর্নীতির তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৬ বার
বিগত সরকারের দুর্নীতির তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেছেন, বিগত সরকারের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সুপারিশ ও পরামর্শ অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস ও জ্বালানি নিরাপত্তা, রেল যোগাযোগ, মাঠ প্রশাসনের সংস্কার, কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কিছু অনিয়ম নজরে এসেছে। এসব প্রকল্প তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি প্রকল্পের তদন্তও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের হাতে এলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। প্রকল্প প্রণয়ন থেকে শুরু করে অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনেক সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে। ফলে নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা সম্ভব হয় না।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। অনুমোদনের পর প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি দ্রুত শেষ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনসংক্রান্ত বিদ্যমান নির্দেশিকা সময়োপযোগী করার কাজ চলছে।

চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা এবং মাঠপর্যায়ে তদারকিও বাড়ানো হচ্ছে। ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের মতো কাজে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যেসব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি, সেগুলোর বিলম্বের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকল্প সংশোধনের কারণ পর্যালোচনা করে বিলম্বের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংসদকে জানান প্রধানমন্ত্রী।

যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নতুন করে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব প্রকল্প পুনর্বিন্যাস, প্রকল্পের পরিধি পরিবর্তন অথবা চলমান রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেওয়ার পরিবর্তে সমন্বিত কর্মসূচির অধীনে গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ই-জিপির ব্যবহার আরও সম্প্রসারণের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

সংসদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। সরকারি দলের সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাময়িক বা আকস্মিক গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন, ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। স্থলভাগে অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬ প্রণয়নের কাজও এগিয়ে চলছে।

দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।

ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্যাস নেটওয়ার্কে যুক্ত করার বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস জাতীয় নেটওয়ার্কে নিতে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে। তাই স্থানীয়ভাবে গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভোলা অঞ্চলে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ভোলায় গ্যাসের যথাযথ ব্যবহারের জন্য একটি সার কারখানা এবং ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং শিল্প ও রপ্তানি খাতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন তিনি।

রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সরকারের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। চট্টগ্রাম-ঢাকা করিডোরে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর লক্ষ্যে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ ডিজাইনের কাজ শেষ হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর প্রকল্পের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। টঙ্গী-আখাউড়া এবং লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ ডিজাইনের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে লাকসাম-চট্টগ্রাম ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। টঙ্গী-আখাউড়া অংশের প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নও শেষ পর্যায়ে।

মাঠ প্রশাসনকে আরও জনবান্ধব, স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে সংস্কার কার্যক্রমের কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেবা সহজীকরণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি, পরিদর্শন ও তদারকি এবং গণশুনানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন এবং নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কৃষিক্ষেত্রেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সেচকাজে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত পানির পাম্পের পরিবর্তে কৃষকদের সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সৌরবিদ্যুতের স্টোরেজে পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার কথাও জানান তিনি। দেশে লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনকারী শিল্প স্থাপনে সরকার সহযোগিতা করবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও সংসদে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়। বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। নগরের বিভিন্ন খাল ও সার্ভিস ড্রেন থেকে মাটি ও আবর্জনা অপসারণের কাজ চলছে। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় খাল রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি নতুন খাল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরের অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ৪৮ কিলোমিটার রাস্তা, দুটি কালভার্ট ও ছয়টি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি খেলার মাঠের উন্নয়ন শেষ হয়েছে এবং আরও ছয়টি মাঠের উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে।

এদিকে পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদেরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংসদ ভবনে সানিডেল স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি পরিবেশ রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের সরকারি উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের এলাকায় গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।

সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও সংসদে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো, যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিক করা এবং পরিবেশ রক্ষাকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার একটি সমন্বিত চিত্র উঠে এসেছে। এখন এসব পরিকল্পনা কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্তে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত