কাঁচপুর-ইলিশা ফেরি চালু, ভোলার যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩১ বার
নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে ভোলার নৌপথে নতুন দুয়ার খুলল

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে ভোলার ইলিশা ঘাট পর্যন্ত নতুন ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ ও রাজধানী ঢাকার নৌযোগাযোগে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। দীর্ঘ সড়কপথের যানজট, অতিরিক্ত ভ্রমণসময় ও নানা ধরনের ভোগান্তি এড়িয়ে পণ্যবাহী যানবাহন সরাসরি কাঁচপুর থেকে ইলিশা যাতায়াতের সুযোগ পাওয়ায় পরিবহন চালক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে।

মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ১২টি বড় মালবাহী ট্রাক ও দুটি ছোট গাড়ি নিয়ে ‘বেগম সুফিয়া কামাল’ ফেরি কাঁচপুর সেতুর নিচের কাঁচপুর ফেরিঘাট থেকে ইলিশার উদ্দেশে যাত্রা করে। প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টার যাত্রা শেষে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফেরিটি ইলিশা ঘাটে পৌঁছায়। নতুন এই নৌপথে বর্তমানে দুটি ফেরি চলাচল করছে। প্রতিদিন দুই প্রান্ত থেকে একটি করে ফেরি ছাড়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন করপোরেশন বা বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে জানা গেছে, ‘বেগম সুফিয়া কামাল’ ও ‘বেগম রোকেয়া’ নামের দুটি ফেরি কাঁচপুর-ইলিশা নৌপথে চলাচল শুরু করেছে। একেকটি ফেরির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন নৌপথে ফেরির প্রয়োজনীয়তা কিছুটা কমে যাওয়ায় অন্য এলাকা থেকে দুটি ফেরি এনে এই নতুন রুটে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ফেরির ক্যাপ্টেন মো. জহির উদ্দিনের ভাষ্য, নতুন এই সার্ভিস চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বন্দর এলাকার যানবাহনের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। একই সঙ্গে নরসিংদী, সিলেটসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা পণ্যবাহী যানবাহনও এই নৌপথ ব্যবহার করতে পারবে। এতে দক্ষিণাঞ্চল ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে পণ্য পরিবহনের একটি বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হবে।

কাঁচপুর থেকে ইলিশা পর্যন্ত ফেরিতে বড় মালবাহী ট্রাকের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার টাকা। মিনি ট্রাকের জন্য ভাড়া ৯ হাজার টাকা, ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ৫ হাজার টাকা এবং মোটরসাইকেলের জন্য ৫০০ টাকা। তবে পরিবহন চালকদের কেউ কেউ এই ভাড়া আরও কমানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নৌপথটির ব্যবহার আরও বাড়বে।

নতুন ফেরি সার্ভিস চালুর আগে গত ২৭ আগস্ট কাঁচপুর-ইলিশা নৌপথে পরীক্ষামূলকভাবে ফেরি চলাচল শুরু হয়। পরে মঙ্গলবার বিকেলে কাঁচপুর সেতুর নিচে কাঁচপুর ফেরিঘাট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সার্ভিসটির উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন, সেতু ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ভোলার সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য তিনটি সেতু ও সড়ক নির্মাণের প্রয়োজন হবে এবং পুরো কাজ শেষ হতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।

মন্ত্রী বলেন, স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত কাঁচপুর-ইলিশা ফেরি সার্ভিস ভোলার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে। এই নৌপথে মানুষের যাতায়াতের চাহিদা বাড়লে ভবিষ্যতে ফেরির সংখ্যাও বাড়ানো হবে।

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে ভোলার সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নদীবেষ্টিত এই জেলার মানুষের পণ্য পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন সময়ে দেশের বড় শহরগুলোতে যাতায়াত করতে হয়। সরাসরি ফেরি সার্ভিস চালুর ফলে এসব ক্ষেত্রে যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে পণ্য পরিবহনে এই নৌপথের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ভোলা থেকে মাছ, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠাতে সড়ক ও নৌযোগাযোগের সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। কাঁচপুরের সঙ্গে সরাসরি ফেরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এসব পণ্য তুলনামূলক সহজে রাজধানী ও দেশের বড় পাইকারি বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।

নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শংকর সাহার মতে, নতুন ফেরি সার্ভিস ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। দক্ষিণাঞ্চলে পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদা বাড়লে ব্যবসায়িক কার্যক্রমও বিস্তৃত হবে। পরিবহন ব্যয় কমানো সম্ভব হলে শেষ পর্যন্ত এর সুফল সাধারণ ভোক্তারাও পেতে পারেন।

পরিবহন চালকরাও ফেরি সার্ভিস চালু হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বড় মালবাহী ট্রাকচালক সোহেল রানা জানান, ফেরির মাধ্যমে পণ্যবাহী গাড়ি নিয়ে দিনে ভোলায় যাওয়া এবং রাতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে সড়কপথে দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানোর চাপ কিছুটা কমতে পারে।

আরেক চালক আবুল কাশেম বলেন, সড়কপথে যানজটের পাশাপাশি চালকদের বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। ফেরিতে যানবাহন পারাপারের সময় চালকেরা বিশ্রামের সুযোগ পান। ফলে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। তিনি নৌপথটি নিয়মিত ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন।

তবে ফেরি সার্ভিসের কার্যকারিতা ধরে রাখতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্ধারিত সময়ে ফেরি ছাড়ার নিশ্চয়তা, ঘাটে যানবাহন ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত ফেরি, যাত্রী ও চালকদের প্রয়োজনীয় সুবিধা এবং যুক্তিসংগত ভাড়া নিশ্চিত করা গেলে এই নৌপথের ওপর মানুষের আস্থা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বর্ষা, নদীর নাব্যতা ও আবহাওয়ার মতো বিষয়গুলোর ওপরও ফেরি চলাচলের স্বাভাবিকতা নির্ভর করবে।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, ফেরি চালুর স্থানে আগে থেকেই রাস্তা ছিল। সেটিকে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে সেখানে পন্টুন স্থাপন করা হয়েছে। নৌপথ চালুর অবকাঠামোগত কাজের ব্যয় নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে। নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল বিভাগ থেকে ব্যয়ের হিসাব করা হচ্ছে।

কাঁচপুর-ইলিশা ফেরি সার্ভিস শুধু পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেই নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। ভোলার অনেক মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বড় শহরগুলোতে যান। শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদেরও বিভিন্ন প্রয়োজনে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যাতায়াত করতে হয়। সরাসরি নৌযোগাযোগ তাদের যাত্রার বিকল্প তৈরি করতে পারে।

এই নৌপথকে ঘিরে ঘাটকেন্দ্রিক ছোট ব্যবসা, পরিবহনসেবা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিয়মিত ফেরি চলাচল নিশ্চিত হলে কাঁচপুর ও ইলিশা উভয় প্রান্তে স্থানীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিস্তৃত হতে পারে। পাশাপাশি ভোলা থেকে রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি নতুন রুট হিসেবে এ পথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে সার্ভিসটি কতটা নিয়মিত ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয় তার ওপর। বর্তমানে দুইটি ফেরি দিয়ে প্রতিদিন একটি করে ফেরি দুই প্রান্ত থেকে ছাড়ছে। যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ বাড়লে সেই অনুযায়ী ফেরির সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।

স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ চালু হলে এই ফেরি রুটের প্রয়োজনীয়তা ভবিষ্যতে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে হতে পারে। কিন্তু সেই অবকাঠামো তৈরি হতে কয়েক বছর সময় লাগার সম্ভাবনা থাকায় অন্তর্বর্তী সময়ে কাঁচপুর-ইলিশা নৌপথ ভোলা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে নতুন এই ফেরি সার্ভিস ভোলার মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগসংকট কিছুটা কমানোর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করেছে। নিয়মিত পরিচালনা, পর্যাপ্ত ফেরি, নিরাপদ যাত্রা এবং সাশ্রয়ী ভাড়া নিশ্চিত করা গেলে কাঁচপুর-ইলিশা নৌপথ শুধু একটি পরিবহন রুট হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত