প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাস থেকে ৪০ কেজি গাঁজা উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার বিকেলে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের আগরপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় র্যাব-১৪ কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে গাঁজার চালানটি জব্দ করেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করা হয়েছে।
তবে মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে। উপস্থিত সংবাদকর্মী ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, অভিযান চলাকালে ছবি ও ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে তাদের বাধা দেওয়া হয়। এমনকি কয়েকজন সাধারণ পথচারীর মোবাইল ফোনও সাময়িকভাবে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে র্যাবের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আগরপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে র্যাব-১৪-এর একটি দল। মাদকদ্রব্যের বড় একটি চালান পরিবহনের খবর পেয়ে সন্দেহভাজন একটি সাদা মাইক্রোবাসের গতিরোধ করা হয়। পরে গাড়িটিতে তল্লাশি চালানো হলে ভেতর থেকে ১৬টি বস্তায় মোড়ানো গাঁজা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা গাঁজার মোট ওজন ৪০ কেজি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে থাকা লোকজনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়। জনবহুল আঞ্চলিক মহাসড়কে প্রকাশ্য স্থানে অভিযান হওয়ায় স্থানীয় মানুষ এবং সংবাদকর্মীরা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন। সংবাদ সংগ্রহের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে কয়েকজন সাংবাদিক ছবি ও ভিডিও ধারণের চেষ্টা করেন। তখনই তাদের সঙ্গে র্যাব সদস্যদের বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
স্থানীয় এক সংবাদকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও ধারণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। এ নিয়ে ঘটনাস্থলে কিছুটা উত্তেজনাও তৈরি হয়। সাংবাদিকদের অভিযোগ, মাদক উদ্ধারের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ঘটনার তথ্য ও দৃশ্য ধারণে বাধা দেওয়া সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে র্যাবের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া না যাওয়ায় ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে আরও পরিষ্কার তথ্য প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযানে ৪০ কেজি গাঁজা উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় পর্যায়ে মাদকবিরোধী তৎপরতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কুলিয়ারচরসহ কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মাদক পরিবহন ও বিক্রির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দীর্ঘদিন ধরে চলছে। বড় পরিমাণের মাদকদ্রব্য জব্দের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে একদিকে স্বস্তি তৈরি করলেও, অন্যদিকে অভিযানের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নিয়েও স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।
ঘটনাটিকে ঘিরে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে থানায় মামলা বা লিখিত অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, অভিযান পরিচালনার কয়েক ঘণ্টা পরও কুলিয়ারচর থানায় এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা সংক্রান্ত তথ্য পৌঁছায়নি। কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী আরিফ উদ্দিন জানিয়েছেন, মাদক আটকের বিষয়ে তখন পর্যন্ত থানায় মৌখিক বা দাপ্তরিক কোনো তথ্য পৌঁছেনি। অভিযোগ বা প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পর সাধারণত জব্দ করা মাদক, আটক ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট যানবাহনকে কেন্দ্র করে আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কখন মামলা হয়েছে, কোন আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে—এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে জব্দ করা মাদকের নমুনা, ওজন ও অন্যান্য প্রক্রিয়াও আইন অনুযায়ী সম্পন্ন হওয়ার কথা।
সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগটিও তাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি রাখে। মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় নিরাপত্তা বা অভিযান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংবাদকর্মীদের নির্দিষ্ট সীমারেখা মেনে চলতে বলতে পারে। তবে সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জনসমক্ষে পরিচালিত কোনো অভিযানের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ নিয়ে যেন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, একটি অভিযানের সফলতা শুধু মাদক উদ্ধারের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না; এর সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা, জব্দকৃত আলামতের সংরক্ষণ এবং জনগণের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে সংবাদকর্মীরা যাতে কোনো ধরনের ভয় বা চাপ ছাড়াই তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন, সেটিও একটি সুস্থ গণমাধ্যম পরিবেশের অংশ।
ঘটনার বিষয়ে র্যাব-১৪-এর দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগের প্রকৃত কারণ এবং পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হতে পারে। অভিযানের সময় ঠিক কী ঘটেছিল, সাংবাদিক বা সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোন নেওয়া হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে কী কারণে নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে ৪০ কেজি গাঁজা উদ্ধারের ঘটনাটি কুলিয়ারচরে মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদারের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। মাদকের বিস্তার রোধে শুধু অভিযান নয়, মাদক পরিবহনের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা এবং তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, এ ধরনের অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং মাদক ব্যবসার মূল উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে এই ঘটনায় সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগেরও নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় সংবাদকর্মীরা। কারণ একটি মাদকবিরোধী অভিযান যেমন জনস্বার্থের বিষয়, তেমনি সেই অভিযানের তথ্য জনসাধারণের কাছে তুলে ধরাও সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্বশীলতা এবং পেশাগত সীমারেখা বজায় থাকলে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে কুলিয়ারচরের আগরপুর বাসস্ট্যান্ডের এই অভিযান দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—একদিকে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনা, অন্যদিকে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ। মাদক উদ্ধারের ঘটনায় পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ এবং সাংবাদিকদের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে পুরো ঘটনার চিত্র আরও পরিষ্কার হবে। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এ ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।