সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারের প্রস্তুত করা সংশোধনীর খসড়ায় মানহানি, কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা, বুলিং এবং গুজব ও অপতথ্য প্রচারের মতো বিষয়কে নতুন করে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিধানগুলোকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও পরবর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইনের সঙ্গে তুলনা করছেন বিশেষজ্ঞ, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, খসড়ায় ব্যবহৃত কিছু শব্দ ও অপরাধের সংজ্ঞা যথেষ্ট স্পষ্ট না হলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যার ব্যাপক সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং অনলাইনে সরকারের সমালোচনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো সংশোধনীর বিষয়ে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানানো হয়নি।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মানহানির জন্য কারাদণ্ডের বিধান। সংশোধনীর খসড়ায় পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অনলাইনে মানহানিকর বক্তব্যের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান ছিল। ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের পর ২০২৩ সালে ওই আইন বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হয়। নতুন আইনে মানহানির জন্য কারাদণ্ডের পরিবর্তে অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানহানিসহ কিছু বিতর্কিত ধারা বাদ দিয়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরে সেটিকে আইনে রূপ দেওয়া হয়।

এখন সেই আইনে আবার মানহানি ও হেয় প্রতিপন্নের মতো বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগই মূলত নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করছেন, সাইবার অপরাধ দমন ও অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন থাকলেও মতপ্রকাশ-সংক্রান্ত বিষয়কে একই আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করলে আগের সমস্যাগুলো ফিরে আসতে পারে।

সংশোধনীর খসড়ায় বিদ্যমান আইনের একটি ধারায় ‘মানহানি’, ‘হেয় প্রতিপন্ন’ ও ‘বুলিং’ শব্দ যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মানহানির ব্যাখ্যায় প্রচলিত দণ্ডবিধির সংজ্ঞা অনুসরণের কথা বলা হলেও এর আওতা ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তৈরি বা প্রকাশিত বিভিন্ন ধরনের তথ্য, অডিও, ভিডিও, ছবি, গ্রাফিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি কনটেন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত করার প্রস্তাব রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের জায়গাটি এখানেই। তাদের মতে, কোনো কনটেন্ট সত্য, মিথ্যা, বিকৃত, বিভ্রান্তিকর বা অপমানজনক—এ ধরনের বিষয় নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড না থাকলে আইন প্রয়োগকারীর হাতে ব্যাপক ব্যাখ্যাগত ক্ষমতা চলে যেতে পারে। রাজনৈতিক বক্তব্য, ব্যঙ্গচিত্র, সমালোচনামূলক লেখা কিংবা কোনো অনিয়মের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও মানহানির অভিযোগ তোলা সম্ভব হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

গবেষণা সংস্থা টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের মতে, সংশোধনীতে মানহানির সংজ্ঞা আগের তুলনায় বিস্তৃত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ‘অবমাননা’, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’ সংক্রান্ত নতুন অপরাধ যুক্ত করার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব শব্দের সুনির্দিষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ সংজ্ঞা না থাকলে একটি বক্তব্য বা তথ্যকে কীভাবে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, খসড়াটি কার্যকর হলে সাইবার জগত মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জায়গার বদলে নিপীড়নের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও বলছেন, অনলাইন অপরাধ মোকাবিলার নামে যেন ভিন্নমত দমন বা সমালোচনা বন্ধ করার সুযোগ তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

গুজব ও অপতথ্যের বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে আতঙ্ক, সহিংসতা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তা অবশ্যই মোকাবিলা করা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো তথ্যকে গুজব বা অপতথ্য হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য নির্ভরযোগ্য যাচাই প্রক্রিয়া না থাকলে আইনটির অপব্যবহারের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।

খসড়ায় গুজব বলতে এমন অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে বোঝানোর প্রস্তাব রয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে অপতথ্য বলতে ব্যক্তি, জনগণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বোঝানোর কথা বলা হয়েছে।

এখানে ‘সম্ভাবনা’ এবং ‘উদ্দেশ্য’ নির্ধারণের বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য সত্য হলেও সেটি সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। আবার কোনো অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হলেও সাংবাদিকতা বা মানবাধিকার অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তা প্রকাশিত হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে তথ্যটি গুজব, অপতথ্য নাকি অনুসন্ধানভিত্তিক প্রতিবেদন—তা নির্ধারণে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতাও এই উদ্বেগকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর থাকার সময়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষার্থী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ওই আইনে মামলা হওয়ার বহু ঘটনা আলোচনায় এসেছিল। বিভিন্ন গবেষণায় ওই সময়ে ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে বিপুলসংখ্যক মামলা ও আসামির তথ্য উঠে আসে। এসব মামলার বড় একটি অংশ রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং বিভিন্ন ধরনের সমালোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল লেখক মুশতাক আহমেদের গ্রেপ্তার ও কারাগারে তার মৃত্যু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য ও কনটেন্ট প্রকাশের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পর তার মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিবাদের জন্ম দেয়। ফলে অনলাইন বক্তব্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে তখন দেশ-বিদেশে প্রশ্ন উঠেছিল।

বর্তমান প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অবশ্য আগের সব বিধান ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়নি। সংশোধনীর পরও আইনটির অধীনে মামলা করার সুযোগ সীমিত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। শুধু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি, তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি অথবা পুলিশ মামলা করতে পারবেন। একই সঙ্গে আইনের অধীন মামলাগুলো জামিনযোগ্য রাখার প্রস্তাবও বহাল রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া সাইবার অপরাধের প্রকৃত ক্ষেত্র—হ্যাকিং, জালিয়াতি, প্রতারণা, অননুমোদিত ই-লেনদেন, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, রিভেঞ্জ পর্ন, শিশু যৌন নিপীড়ন এবং ধর্মীয় বা জাতিগত সহিংসতা ও বিদ্বেষ ছড়ানো—এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বড় ধরনের মতবিরোধ নেই। বিতর্কের মূল জায়গা হলো, এসব প্রকৃত সাইবার অপরাধের সঙ্গে মতপ্রকাশ ও সমালোচনাকে কীভাবে পৃথক রাখা হবে।

সংশোধনীর আরেকটি প্রস্তাবে সাইবার নিরাপত্তা কাউন্সিলের কাঠামোতেও পরিবর্তনের কথা রয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও কোনো কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা সরকারকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে কোন কনটেন্ট কেন ব্লক করা হলো, সে বিষয়ে কারণ জানানো বাধ্যতামূলক না করার প্রস্তাব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকারের ভেতরেও সংশোধনী নিয়ে মতভিন্নতা থাকার কথা উঠে এসেছে। একদিকে অনলাইনে গুজব, অপতথ্য, কুৎসা ও ব্যক্তিগত হয়রানি ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার অবস্থানের সঙ্গে নতুন করে কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করার বিষয়টি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সাইবার জগতের বাস্তবতা প্রতিদিন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম এবং অনলাইন লেনদেনের বিস্তারের সঙ্গে সাইবার অপরাধের ধরনও বদলাচ্ছে। ফলে নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা ও ডিজিটাল অধিকার রক্ষার জন্য কার্যকর আইন প্রয়োজন। তবে সেই আইন যেন একই সঙ্গে নাগরিকের ন্যায়সংগত সমালোচনা, সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও সুরক্ষা দেয়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রযুক্তিবিদ, মানবাধিকারকর্মী এবং নাগরিক সমাজের মতামত গ্রহণ করা হলে বিতর্কিত বিষয়গুলো আরও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে মানহানি, হেয় প্রতিপন্ন, বুলিং, গুজব ও অপতথ্যের মতো শব্দের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা এবং স্বাধীন যাচাইয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে আইন অপব্যবহারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

সব মিলিয়ে, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন অপরাধ দমন যেমন জরুরি, তেমনি আইন যেন রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তির হাতিয়ার হয়ে না ওঠে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অতীতের বিতর্কিত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ, স্পষ্ট ও অধিকারসম্মত আইন প্রণয়নই এখন সংশ্লিষ্টদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত