বাংলাদেশের শিপ খাতে ১৫ মিলিয়ন ডলারের কোরীয় প্রকল্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
বাংলাদেশের শিপ খাতে ১৫ মিলিয়ন ডলারের কোরীয় প্রকল্প

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিং, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ খাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা)। ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের আওতায় কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সামুদ্রিক শিল্পে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

চট্টগ্রাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সেমিনার হলে রোববার চট্টগ্রাম চেম্বার ও শিপ রিসাইক্লিং খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কোইকা প্রতিনিধি দলের মতবিনিময় সভায় প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। সভায় বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিং শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, সম্ভাবনা, দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে দক্ষতা উন্নয়নের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ওপর একটি তথ্যচিত্র উপস্থাপন করা হয়।

কোইকা বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর হিউনউ ইয়াং বলেন, বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিং খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা করতে কোরিয়া আগ্রহী। এ খাতে উন্নত ওয়েল্ডিং প্রযুক্তি, আধুনিক কর্মপদ্ধতি এবং কারিগরি জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং শিল্পে আরও বেশি মূল্য সংযোজন করাই প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।

কোইকার পরিচালিত সমীক্ষায় বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিং খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। হিউনউ ইয়াংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, খাতটির চাহিদার তুলনায় মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ জনশক্তির প্রয়োজনীয় দক্ষতা রয়েছে। অর্থাৎ শিল্পের পরিধি ও প্রযুক্তিগত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা এখনও খুবই কম। এই ঘাটতি পূরণে শিপ ব্রেকিং, শিপ বিল্ডিং এবং শিপ মেইনটেন্যান্স—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ-কোরিয়া টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে আরও আধুনিক ও শিল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে মিল রেখে কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন করা হবে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও কর্মপদ্ধতি শিক্ষার্থীদের কাছে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারেন।

শুধু প্রশিক্ষণ অবকাঠামো তৈরি করাই নয়, শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ শিপ রিসাইক্লিং ও জাহাজ নির্মাণের মতো শিল্পে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। ওয়েল্ডিং, ধাতু কাটিং, যন্ত্রপাতি পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন কাজে বাস্তব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের এসব বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে পারলে দেশের শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিং শিল্প মূলত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পুরোনো জাহাজ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের লোহা ও অন্যান্য উপকরণ দেশের শিল্প খাতে সরবরাহ করা হয়। এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পর্যায়ের উদ্যোক্তা। ফলে এ শিল্পের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে বৃহত্তর কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ খাতও ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে দক্ষ প্রকৌশলী, ওয়েল্ডার, মেশিন অপারেটর, টেকনিশিয়ান এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত কর্মীর প্রয়োজন বাড়বে। একইভাবে জাহাজের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত কার্যক্রমেও বিশেষায়িত দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। এসব ক্ষেত্রের দক্ষতা উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া গেলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক শিল্প একটি সমন্বিত দক্ষ মানবসম্পদ কাঠামো গড়ে তুলতে পারে।

কোইকার প্রতিনিধি হিউনউ ইয়াং আরও জানান, কোরিয়ার শিপ রিসাইক্লিং কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশের ইয়ার্ডে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিং খাতের সক্ষমতা ও সম্ভাবনা যাচাই করে সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে। তাঁর মতে, দক্ষ জনবলের ঘাটতি কমানো গেলে শিল্পটির উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।

কোরিয়ার এই আগ্রহ বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে পারলে দেশের শিপ রিসাইক্লিং শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশ, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং আধুনিক শিল্প ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও উন্নতির সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষ কর্মী তৈরি হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রাম ক্রমেই দেশের বিনিয়োগ ও লজিস্টিকস হাবে পরিণত হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং উপকূলীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে এ অঞ্চলের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে গ্রিন শিপ বিল্ডিং হাব গড়ে তোলার সরকারি পরিকল্পনাও সামুদ্রিক শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করছে।

তিনি বলেন, একদিকে মাতারবাড়ীতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব জাহাজ নির্মাণের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সীতাকুণ্ড উপকূলে রয়েছে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শিপ রিসাইক্লিং শিল্প। ফলে এ দুটি খাতকে কেন্দ্র করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা গেলে চট্টগ্রাম অঞ্চল বাংলাদেশের সামুদ্রিক শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে দক্ষতার উন্নয়ন না ঘটলে বড় বিনিয়োগ এলেও তার পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন। প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে কর্মীদের দক্ষতা যত বাড়বে, ততই কাজের মান, উৎপাদনশীলতা এবং নিরাপত্তা উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একই সঙ্গে দক্ষ কর্মীরা দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারেন।

মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন, উপদেষ্টা জহিরুল ইসলাম রিংকু, মাস্টার স্টিল অ্যান্ড অক্সিজেন লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাস্টার আবুল কাশেম, এইচআর শিপ ম্যানেজমেন্টের সিইও মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, চট্টগ্রাম চেম্বার পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. গোলাম সরওয়ারসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। কোইকা বিশেষজ্ঞ চুং ইয়ুপ কিম বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে দক্ষতা উন্নয়নের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ওপর তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ২০২৭ সালে শুরু হয়ে ২০৩১ সাল পর্যন্ত চলা এই প্রকল্প বাংলাদেশের সামুদ্রিক শিল্পে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি তৈরি করবে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক কারিকুলাম, প্রশিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তবভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে নতুন প্রজন্মের দক্ষ কর্মী তৈরি হলে দেশের শিপ রিসাইক্লিং, জাহাজ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে নতুন গতি আসতে পারে। একই সঙ্গে কোরিয়ার প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও বিনিয়োগ আগ্রহ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনাও আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত