প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা সিএমএসএমই খাতে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পুনঃঅর্থায়ন চুক্তি করেছে মধুমতি ব্যাংক। পাঁচ হাজার কোটি টাকার সিএমএসএমই খাতের চলতি মূলধন পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় এই চুক্তি করা হয়েছে। এর ফলে নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলকভাবে কম সুদে অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. আনিছুর রহমান। মধুমতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিউল আজম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক মো. জবদুল ইসলাম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের অধীনে সিএমএসএমই গ্রাহকদের ৯ শতাংশ সুদে অর্থায়ন সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে মধুমতি ব্যাংক। উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধনের প্রয়োজন মেটানো এবং ব্যবসার কার্যক্রম সচল রাখতে এই অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সিএমএসএমই খাতের গুরুত্ব দীর্ঘদিনের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ও মাঝারি আকারের অসংখ্য ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় বাজারের পণ্য উৎপাদন, বিপণন, সরবরাহ, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। তবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব অনেক উদ্যোক্তার জন্য নিয়মিত একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে চলতি মূলধনের সংকট হলে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কাঁচামাল কেনা, শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ, পণ্য মজুত করা, সরবরাহকারীর পাওনা পরিশোধ কিংবা নতুন অর্ডার বাস্তবায়নের মতো কাজে নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন হয়। ছোট উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে নিজস্ব মূলধন সীমিত থাকায় ব্যাংকঋণ অনেক সময় ব্যবসা সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থার আওতায় ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। মধুমতি ব্যাংকের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তিটিও সেই উদ্যোগের অংশ। ব্যাংকটি জানিয়েছে, চুক্তির আওতায় নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের অর্থায়ন সুবিধা দেওয়া হবে।
৯ শতাংশ সুদে অর্থায়নের সুযোগ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ ব্যবসার আকার ছোট হওয়ায় তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই ঋণের ব্যয় সরাসরি পরিচালন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত সুদে ঋণ পাওয়া গেলে ব্যবসার নগদ অর্থপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা কিছুটা সহজ হতে পারে। তবে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের নির্ধারিত যোগ্যতা, নথিপত্র, ঋণ মূল্যায়ন ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হবে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মধুমতি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চিফ বিজনেস অফিসার আরব ফজলুর রহমান, সিএমএসএমই বিজনেস সাপোর্ট বিভাগের প্রধান জাহিদ আল মুনতাসির এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক নাহিদ রহমান ও অতিরিক্ত পরিচালক শাহানাজ পারভীন উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এই খাতের উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়ানো হলে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সম্ভাবনাও থাকে।
তবে সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। অর্থায়নের পাশাপাশি সহজ প্রক্রিয়া, সময়মতো ঋণ বিতরণ, ব্যবসায়িক পরামর্শ এবং ঋণ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তাদের অনেকেই ব্যাংকিং প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মধুমতি ব্যাংকের সঙ্গে করা এই চুক্তির ফলে ব্যাংকটির সিএমএসএমই ঋণ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ব্যবসা ও শিল্পের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তাদের কাছে এই অর্থায়ন পৌঁছাতে পারলে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
মধুমতি ব্যাংক ২০১৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে সারা দেশে ব্যাংকটির ৫৬টি শাখা ও ছয়টি উপশাখা রয়েছে বলে ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।
ব্যাংকিং খাতে সিএমএসএমই অর্থায়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বিস্তৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। বড় শহরের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো গেলে ছোট ব্যবসার জন্য আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়তে পারে। মধুমতি ব্যাংকের শাখা ও উপশাখা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এ ধরনের অর্থায়ন কতটা বিস্তৃতভাবে উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অর্থনীতিতে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ভূমিকা অনেকটা নীরব হলেও এর প্রভাব বিস্তৃত। একটি ছোট কারখানায় কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে স্থানীয় বাজারে পণ্য সরবরাহ—এ ধরনের বহু কর্মকাণ্ড একসঙ্গে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করে। তাই এই খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়লে তার সুফল শুধু ঋণগ্রহীতা উদ্যোক্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; কর্মী, সরবরাহকারী, পরিবেশক ও ভোক্তার ওপরও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।
তবে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের অর্থ যথাযথ খাতে ব্যবহার এবং ঋণের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি। ঋণ যদি উৎপাদনশীল ও ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে উদ্যোক্তার আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকের ঋণ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতাও শক্তিশালী হতে পারে। বিপরীতে অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হলে উদ্যোক্তার আর্থিক চাপ বাড়ার পাশাপাশি খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
মধুমতি ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এই চুক্তির মাধ্যমে তাই একদিকে যেমন সিএমএসএমই খাতে নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে উদ্যোক্তাদের কাছে অর্থ কতটা সহজে পৌঁছায় এবং তারা তা কীভাবে ব্যবহার করেন তার ওপর। সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন, স্বচ্ছ ঋণ বিতরণ এবং উৎপাদনশীল কাজে অর্থের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ দেশের ছোট ও মাঝারি ব্যবসার বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।
সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো টেকসইভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত চলতি মূলধন নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় মধুমতি ব্যাংকের নতুন অর্থায়ন কর্মসূচি সেই প্রয়োজনের একটি অংশ পূরণ করার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন এই অর্থায়ন কতজন উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছায়, কোন কোন খাতে ব্যবহার হয় এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে এর বাস্তব প্রভাব কতটা পড়ে—সেদিকেই থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের নজর।