প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজায় চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকটের মধ্যে ইসরায়েলের জন্য ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের নতুন অস্ত্র প্যাকেজের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। প্রস্তাবিত এই প্যাকেজে প্রায় ৪০ হাজারটি ২ হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা এবং ভূগর্ভস্থ বা শক্ত স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যবহারের উপযোগী যুদ্ধাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। পরিকল্পনাটি এখনো চূড়ান্ত বিক্রয় চুক্তি হিসেবে সম্পন্ন হয়নি; তবে সংশ্লিষ্ট কংগ্রেসনাল কমিটিগুলোকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত অস্ত্র প্যাকেজের মধ্যে ২০ হাজার এমকে-৮৪ এবং ২০ হাজার বিএলইউ-১১৭ বোমা রয়েছে। প্রতিটি বোমার ওজন প্রায় ২ হাজার পাউন্ড বা ৯০৭ কেজি। এর সঙ্গে আই-২০০০ পেনিট্রেটর ওয়ারহেডও থাকার কথা রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এসব অস্ত্র বড় ধরনের ধ্বংসক্ষমতার সাধারণ বোমা হিসেবে পরিচিত এবং কিছু সংস্করণ শক্ত স্থাপনা ও ভূগর্ভস্থ কাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই প্রস্তাবিত অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এর সময়কাল। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও এর ফলে সৃষ্ট ব্যাপক প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ধ্বংস এবং মানবিক সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবে, ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংঘাতে ফিলিস্তিনি নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার ৭৮৯-এ পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭৯৮ জন। এসব পরিসংখ্যান গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের; যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে হতাহতের হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হতে পারে।
নতুন অস্ত্র প্যাকেজের অর্থায়নের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে হওয়ার কথা রয়েছে। এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদেশগুলোকে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে। ফলে প্রস্তাবিত প্যাকেজটি শুধু ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে।
২ হাজার পাউন্ডের ভারী বোমা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এর আগেও পরিবর্তন দেখা গেছে। গাজায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এসব অস্ত্র ব্যবহারের ফলে বেসামরিক মানুষের হতাহতের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইসরায়েলের কাছে এ ধরনের কিছু বোমা সরবরাহ স্থগিত করেছিল। পরে ট্রাম্প প্রশাসন সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে। নতুন প্রস্তাবিত প্যাকেজে বিপুলসংখ্যক একই শ্রেণির বোমা অন্তর্ভুক্ত থাকায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
প্রস্তাবিত বিক্রয়ের বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত প্রকাশ্য মন্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণত বড় ধরনের মার্কিন অস্ত্র বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোকে অবহিত করা হয় এবং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চুক্তি এগিয়ে যায়। ফলে বর্তমান পর্যায়ের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত অস্ত্র সরবরাহের সমান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে কংগ্রেসকে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে এর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগোচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাজায় ভারী বোমার ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের উদ্বেগের পেছনে রয়েছে বোমাগুলোর বড় বিস্ফোরণক্ষমতা। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহৃত হলে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি আশপাশের স্থাপনা ও বেসামরিক জনগোষ্ঠীও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণেই ২০২৪ সালে এসব অস্ত্রের সরবরাহ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই নীতিগত বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নতুন প্যাকেজে বিপুলসংখ্যক ভারী বোমা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার খবরে সেই বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের অবস্থান হলো, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর নিজেদের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার জন্য সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে তারা। ওই হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫০ জনের বেশি মানুষকে জিম্মি করা হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েল গাজায় তাদের সামরিক পদক্ষেপকে এই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছে।
তবে গাজায় দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের ফলে বিপুল বেসামরিক প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংসের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৭৮৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহতের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজারে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও হতাহত অব্যাহত রয়েছে এবং অনেক মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে বা দুর্গম এলাকায় আটকে থাকতে পারেন।
এই মানবিক পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত দেশটির অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক এক জরিপের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের মাত্রা নিয়ে মতামতে পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে। একই জরিপে কিছু অংশগ্রহণকারী মনে করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন দিচ্ছে।
নতুন প্যাকেজটি ট্রাম্প প্রশাসনের ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এর আগে প্রশাসন ইসরায়েলের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের আরও কিছু অস্ত্র বিক্রয় অনুমোদন করেছে। ফলে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের এই নতুন প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক সম্পর্কের বিস্তৃত কাঠামোর মধ্যেই এসেছে। একই সঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ ভারী বোমা সরবরাহের পরিকল্পনা গাজায় চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।
গাজার সাধারণ মানুষের জন্য অবশ্য এসব সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব আরও সরাসরি। যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারানো, চিকিৎসা অবকাঠামোর ওপর চাপ, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব বহু মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। সামরিক অভিযানের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
প্রস্তাবিত অস্ত্র প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে তা ইসরায়েলের হাতে বিপুল পরিমাণ নতুন ভারী বোমা ও সামরিক সরঞ্জাম যুক্ত করবে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন, সরবরাহের সময়সূচি এবং অস্ত্রগুলোর বাস্তব ব্যবহার সম্পর্কে এখনো সব তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে স্পষ্ট বিষয় হলো, গাজায় চলমান সংঘাতের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন এই অস্ত্র প্যাকেজ সেই সহযোগিতার পরিধি নিয়ে আবারও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা জোরদার করেছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতাকে সমর্থন করার নীতি অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে গাজায় বিপুল প্রাণহানি ও মানবিক সংকটের কারণে সেই নীতির প্রভাব নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে। প্রস্তাবিত ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ তাই শুধু একটি সামরিক চুক্তির বিষয় নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বেসামরিক সুরক্ষা, যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক উদ্বেগ—সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে।