প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ৭ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন।
মামলাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এর আগে গত ২৭ জুলাই ট্রাইব্যুনাল-২ রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি এবং গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বুধবার মামলায় গ্রেপ্তার ১১ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে বক্তব্য দেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন বাবলু। এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পলাতক ৩০ আসামিকে হাজির হওয়ার জন্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের পলাতক হিসেবে বিবেচনা করে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এর ফলে তারা আদালতে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত না থাকলেও মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে তাদের পক্ষে আইনগত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া এগিয়েছে। আগামী ৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের বক্তব্য শোনার পর অভিযোগ গঠন করা হবে কি না, সে বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, শামসুল হক টুকু, আব্দুর রাজ্জাক, দীপু মনি ও আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। এছাড়া সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির এবং সাবেক গণমাধ্যমকর্মী মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রুপাও এ মামলায় আসামি হিসেবে রয়েছেন।
মামলার বাকি আসামিদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সময় আদালত ও রাষ্ট্রপক্ষের কার্যক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এই মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও আগে জারি করা হয়েছিল। শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে তদন্তে রাষ্ট্রপক্ষ ৫ মে ও পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করেছে।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলায় মোট দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে পরদিন ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মামলার এসব অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগ গঠন হলে রাষ্ট্রপক্ষকে সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য প্রমাণের মাধ্যমে তাদের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইভাবে আসামিপক্ষও নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ পাবে। ফলে ৭ অক্টোবরের শুনানি মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও সেটি কোনো আসামির অপরাধ প্রমাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
শাপলা চত্বরের ২০১৩ সালের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত একটি অধ্যায়। ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তখন থেকেই নিহতের সংখ্যা, অভিযান পরিচালনার ধরন এবং ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দাবি ছিল।
বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ায় আসে। ২০২৬ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন, তদন্তে শাপলা চত্বরের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ৫৮টি মৃত্যুর তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তে ঢাকার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার ঘটনাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
এরপর মামলায় আসামির সংখ্যা এবং অভিযোগের পরিধি নিয়ে কার্যক্রম এগিয়ে যায়। মে মাসেই সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি এবং সাবেক একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু ও সাংবাদিক ফারজানা রুপাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য থাকার কথা জানিয়েছিল।
জুলাই মাসে সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকেও শাপলা চত্বরের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, মন্ত্রী থাকলেও শাপলা চত্বরের ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছু জানতেন না। তার বক্তব্য মামলায় আসামিপক্ষের অবস্থানের একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে আসে।
বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের সামনে মূল প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রপক্ষের আনুষ্ঠানিক অভিযোগের ভিত্তিতে ৪১ আসামির বিরুদ্ধে বিচার এগিয়ে নেওয়ার মতো আইনগত উপাদান রয়েছে কি না। অভিযোগ গঠনের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের অভিযোগের কাঠামো তুলে ধরবে এবং আসামিপক্ষ বা তাদের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা সেই অভিযোগের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের বিষয়টিও বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কোনো আসামি আদালতে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত না থাকলেও তার পক্ষে আইনগত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম চালানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এতে মামলার শুনানি ও পরবর্তী ধাপগুলো আইনগত কাঠামোর মধ্যে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
৭ অক্টোবরের শুনানিকে ঘিরে তাই রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষ এবং মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ওই দিন ট্রাইব্যুনালে মামলার অভিযোগগুলোর ওপর বিস্তারিত শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর অভিযোগ গঠনের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত মামলাটিকে পরবর্তী বিচারিক ধাপে নিয়ে যাবে।
শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও বর্তমানে বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন। ফলে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি যুক্তিই গুরুত্বপূর্ণ হবে। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও দায়ের বিষয়গুলো নির্ধারণ করাই এই মামলার পরবর্তী ধাপগুলোর মূল বিষয়।
আগামী ৭ অক্টোবরের শুনানির পর মামলাটি কোন পথে এগোয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। অভিযোগ গঠন হলে সাক্ষ্যগ্রহণ ও অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে মামলার মূল বিচারপর্ব শুরু হওয়ার পথ আরও স্পষ্ট হবে। আর অভিযোগ গঠন না হলে সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার পরবর্তী আইনি অবস্থানও ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।